Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (শেষ পর্ব)

বাকী পথটুকু কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হওয়া গেল। ঝড়ের গতি এবং বৃষ্টি দুটোই কমে গিয়েছিল তবে থেমে যায় নি একেবারে। গাড়ির গতি কিছুটা কম হলেও বেশি সময় লাগল না ওদের গন্তব্য পৌছতে। লিসার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে ঢুঁকে একটা ফাঁকা পার্কিং এ গাড়ি থামাল ফাহিম। পাশে তাকিয়ে দেখল লিসা চোখ বন্ধ করে আছে। গাড়িতে বেশ খানিকক্ষণ বকবক করে শেষের দিকে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়িতে সময় দেখল ফাহিম, ভোর সারে ৩টার মত বাজে। আড়মোড়া ভেঙে কিছুক্ষণ বসে রইল সে। ঘাড়ের পেছনে অসার হয়ে আছে। বৃষ্টির কারণে সামনের দিকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তাই ঝুঁকে গাড়ি চালাতে হয়েছে প্রায় সারাটা রাস্তা। অবসাদ লাগছে খুব। মাথাটাও ধরে আছে। এত বড় দীর্ঘ পথ আবার ফিরে যেতে হবে ভাবতেই বুক শুকিয়ে আসছে। কিন্তু কী আর করা, একটু কষ্ট হবে তবে ফিরে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
আরো খানিকটা সময় পার করে ফাহিম আলত করে ডাকল, ‘লিসা?’
‘উম!’ চোখ না খুলেই একটা শব্দ করল লিসা।
‘আমরা এসে গেছি।’
‘কোথায়?’
‘গন্তব্যে।’
লিসা চুপ করে আছে। চোখ বন্ধ।
ফাহিম আবার বলল, ‘নামবে না?’
‘না।’
‘আমাকে তো ফিরে যেতে হবে।’
‘না।’
‘মানে কি?’
‘কিছু না।’
‘হেয়ালী কর না।’
‘হেয়ালী করছি না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে বিদায় দিয়ে দাও। আমাকে তো ফিরতে হবে—লং ওয়ে টু গো।’
‘তুমি এখন কোথাও যাচ্ছ না।’
‘কোথাও যাচ্ছি না মানে?’
‘মানে তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’
‘কোথায়?’
‘আমার অ্যাপার্টমেন্টে।’
ফাহিম চুপ করে রইল। এই মেয়ে এসব কী বলছে? সে ভাবল হয়তো ওর কাছে ক্যাশ টাকা নেই, টিপস দিতে পারবে না, তাই সাথে যেতে বলছে। সে বলল, ‘তুমি তো অলরেডি ভাড়া দিয়েছ। আর তুমি আমাকে যে এক্সট্রা টাকা দিতে চেয়েছিলে, তা দিতে হবে না।’
‘দিতে হবে না কেন?’
‘আমি এক্সট্রা টাকার জন্য তোমাকে রাইড দেই নি।’
‘তাহলে কেন দিয়েছ?’
‘কেন দিয়েছি তা তো ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল তুমি সত্যিই বিপদে পরেছ, তাই তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছি। কারো বিপদে সাহায্য করতে পারার ভাগ্যও তো সবার হয় না।’
এবার চোখ খুলে তাকাল লিসা। সোজা হয়ে বসল। তাকাল ফাহিমের দিকে। সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘বাকী রাতটা তুমি আমার এখানে থেকে যাও। তুমি অনেক টায়ার্ড। আমি চাই না, রাস্তায় তুমি ঘুমিয়ে পড় এবং এক্সিডেন্ট কর।’
‘সমস্যা নেই—আমি গাড়িতেই কিছুক্ষণ ন্যাপ নিয়ে নিব। আমার অভ্যাস আছে।’
‘না।’
‘কী না?’
‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে। আমার লিভিং রুমে সোফাবেড আছে—সেখানে একটা ঘুম দিয়ে সকালে আমার হাতে এক কাপ কফি খেয়ে তারপর চলে যেও।’
‘আরে নাহ।’
‘আরে হ্যাঁ।’
ফাহিম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘সো নাইস অফ ইউ লিসা। আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কনসার্ণ, কিন্তু…’
‘কিন্তু কী?’
‘আমার মনে হয় এটা ঠিক হবে না।’
‘কেন ঠিক হবে না?’
ফাহিম কোনো উত্তর দিল না।
‘ওকে নো প্রবলেম, আমিও নামছি না গাড়ি থেকে।’
‘মানে কী?’
‘ভেরী সিম্পল। কয়েক ঘণ্টা রেস্ট না নিয়ে তোমাকে আমি যেতে দিচ্ছি না। একে তো ওয়েদার খারাপ। আসার সময় তুমি বারে বারে হাই তুলছিলে। যাবার সময় তুমি থাকবে একা—তোমার পাশে বসে বকবক করে কেউ তোমাকে জাগিয়ে রাখবে না। ঘুমিয়ে পড়বে এবং নির্ঘাত হাইওয়ে থেকে পাশের খাদে ছিটকে পড়বে। আমি অন্তত তা হতে দিচ্ছি না।’
‘এক্সিডেন্ট যদি করিও—তোমার দায়টা কোথায়? তুমি এত উতলা হচ্ছ কেন?’
‘কারণ আমি তোমাকে জোর করে নিয়ে এসেছি—তোমার মৃত্যুর ভার সারাজীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে। আই ক্যাননট লেট ইট হ্যাপেন।’
ফাহিম মুগ্ধ হয়ে এই অচেনা মেয়েটির কথা শুনল। এবং খানিকটা কৃতজ্ঞতাও বোধ করল। এই বয়সের মেয়েদের আসলেই বোঝা মুস্কিল। এদের মাথায় কখন যে কী এসে ভর করে কে জানে।
লিসা তাকিয়ে আছে ফাহিমের মুখের দিকে। ‘কী হল?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল।
ফাহিম অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটিকে। এ কী ধরণের পাগলামি? ফাহিমের মাথায় শত চিন্তা। সে ঠিক বুঝতে পারছে না ওর কী করা উচিৎ। এই বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে তার অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া আবার রাত থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত? আবার কোনো ঝামেলায় পড়ে না যায়। মেয়েটি একা থাকে না রুমমেট আছে, তাও তো সে জানে না।
‘তোমার বাসায় আর কে আছে?’ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে ফাহিম জানতে চাইল।
‘কেউ নেই—আমি একাই থাকি। কেন?’
‘না মানে…’
‘না মানে কী?’
‘ব্যাপারটা শোভনীয় নয়।’
‘শোভনীয় নয় কেন? তোমাকে তো আমার বিছানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না—’
‘না না আমি সেসব কিছু বলতে চাই নি।’
‘তা হলে কী বলতে চেয়েছ?’
ফাহিম চুপ করে রইল। হঠাৎ করেই বাতাসের শো শো আওয়াজ বেড়ে গেল আবার। বৃষ্টির তেজও বেড়ে যাবে মনে হয়। ফাহিমের মাথায় রাজ্যের চিন্তা শুরু হয়ে গেল। লিসা নামের এই আধ পাগল মেয়েটার যন্ত্রণা থেকে কীভাবে দ্রুত রক্ষা পাওয়া যায় তাই নিয়ে ভাবতে থাকল।
‘কী হল?’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে তবে বেশিক্ষণ থাকব না। তুমি আমাকে এখনই এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াবে। কফি খেয়েই আমি চলে আসব। ডিল?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিসা বলল, ‘ডিল।’
বৃষ্টির তেজ খানিকটা কমে এলেই গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের ভেতর ঢুকে পড়ল লিসা আর ফাহিম। কিছুদূর এগিয়েই লিসার রুম। ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে লিসা বলল, ‘মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল।’
ফাহিম চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। এক বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্ট। ছোট একটা লিভিংরুম—সেখানে একটা সোফা আর একটা কফি টেবিল। বাড়তি কোনো আসবাবপত্র নেই। রুমটাও বেশ ছোটই। ফাহিম ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল।
লিসা বলল, ‘ওয়াশরুমটা ঐদিকে—তুমি ফ্রেশ হয়ে এস, আমি আসছি।’ বলতে বলতে লিসা তার কিচেনে গিয়ে ঢুকল।
প্রচণ্ড ক্লান্তি এসে ভর করেছে ফাহিমের শরীরের। মুখে একটু পানির ঝাপটা দিলে হয়ত ক্লান্তিবোধটুকু কম হবে। ক্লান্তিভাব না কাটা পর্যন্ত গাড়ি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু শরীর টেনে নিয়ে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না ওয়াশরুম পর্যন্ত। কয়েক পা এগিয়ে সোফাতেই বসে পড়ল সে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে এসে লিসা দেখল ফাহিম কাঁচুমাচু হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
হাতের ট্রে কফি টেবিলে রেখে লিসা তার বেডরুম থেকে একটা ব্লাঙ্কেট এনে ফাহিমের গায়ের উপরে দিয়ে দিল। ঘুমের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠতেই ব্লাঙ্কেট খানিকটা সরে গেল ফাহিমের শরীর থেকে। লিসা ব্লাঙ্কেটটি ঠিক করতে গিয়ে ভয়াবহ এক অনুভূতি হল ওর। ঘুমের মধ্যেই লিসার দুহাতের মাঝে মুখগুজে দিল ফাহিম। হঠাৎ করেই লিসা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে নির্বাক বসে থাকল পায়ের উপর হাতের মধ্যে ফাহিমের মুখ নিয়ে।
প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে ফাহিমের ঘুম ভাঙল। এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল, সে শুয়ে রয়েছে একটি অপরিচিত বিছানায়। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল কোথায় আছে সে? পরক্ষণেই মনে পড়ল লিসার বাসায় এসেছে সে রাতে। একটু ধাতস্থ হতেই উঠে বসল ফাহিম।
‘কি সাহেবের ঘুম ভাঙল?’
ফাহিম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বেডরুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে লিসা। সে ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখানে কীভাবে এলাম?’
লিসা আবারও হাসল। রহস্যময়ী হাসি।
‘এসবের মানে কী লিসা? আমি তোমার বেডরুমে কেন?’
‘তোমার কি ধারণা, আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে এসে শুইয়ে দিয়েছি আমার বিছানায়? লজিক কি বলে, এটা সম্ভব?’
চিন্তার সাগরে ডুবে গেল ফাহিম। গত রাতের কথা তেমনিভাবে কিছুই মনে করতে পারছে না সে। ক্যাসেট প্লেয়ার রিওয়াইন্ড করার মত মেমোরি রিওয়াইন্ড করে সর্বশেষ অবস্থান মনে করল—লিসার সোফাতে বসে সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু সেই সোফা থেকে লিসার বেডরুমের বিছানাতে সে কী করে এল? লিসা এভাবে রহস্যপূর্ণ হাসি হাসছে কেন? এর মানে কী?
‘উঠে এস। কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
ফাহিম তাকাল লিসার দিকে। সে বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ঢুকল ওয়াশরুমে। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। মুখে পানির ছিটে দিয়ে চোখ বুজতেই হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝটকায় যেন কাল রাতটা ফিরে এল। সম্পূর্ণ না, ভাঙা ভাঙা টুকরো। সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কতক্ষণ পর সে জানেনা, কেউ একজন তার পা’দুটো তুলে দিয়েছিল সোফাতে। ঘুমের মধ্যেই হাত চেপে ধরেছিল তার।
ভাঙা টুকরোগুলো সব নিমেষেই জোড়া লেগে সামনে চলে এল। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও পারেনি, লিসা দু’হাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। ফিসফিস করে বলে, ‘আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর প্লিজ।’
‘ইউ আর ড্রাঙ্ক লিসা।’
‘বিকজ, আই’ম আপসেট। আমার মনটা ভাল করে দাও।’ মাতাল কণ্ঠে লিসা বলল। তার চোখে আকুলতা স্পষ্ট। বলতে বলতেই সোফা থেকে পড়ে যাবার উপক্রম হল তার।
ফাহিম তাকে ধরে ফেলল, ‘হয়েছে অনেক, এখন চল তোমাকে শুইয়ে দেই—ঘুমোবে।’
দুহাতে লিসাকে তুলে দাড় করাতেই লিসা ফাহিমকে সাপ্টে জড়িয়ে ধরল। বেডরুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলেও ওকে ছাড়ল না। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। লিসা তাকে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরে রাখল। ফাহিম কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল। লিসা ওর ঠোটে জোর করে চুমু খেল।
বিদ্যুৎ চমকের মত সোজা হয়ে দাঁড়াল ফাহিম। মুখ হাত মুছে লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসল। আর তখনই লক্ষ করল দুটো ওয়াইনের গ্লাস আর অর্ধেক খালি বোতল সাইড টেবিলে পরে আছে। ফাহিমের আর বুঝতে বাকি রইল না—কিন্তু তবুও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েই গেল।
লিসা কিচেন থেকে দু’কাপ কফি আর কিছু প্যাস্ট্রি নিয়ে এসে বসল ফাহিমের পাশে। কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ তো ঠিক আছে কি না।’
ফাহিম কফির কাপে আস্তে করে চুমুক দিল। সে কিছুই বলছে না দেখে লিসা বলল, ‘চিনি ঠিক আছে?’
ফাহিম মাথা নাড়ল।
দুজনে চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিয়ে চলল। এক পর্যায়ে ফাহিম বলল, ‘আমাকে যেতে হবে।’
‘জানি।’
আবারও নীরবতা। কিছু একটা বলতে চেয়েও না বলে উঠে দাঁড়াল ফাহিম। তাকাল লিসার দিকে, ভাবলেশহীন দৃষ্টি। মুখে কিছু না বললেও মাথার ভেতর চলছে হাজারো প্রশ্ন। কিছু একটা জট পাকিয়ে আছে—জট না খোলা পর্যন্ত অস্থিরতা কমছে না। ফাহিম ইতস্তত করে বলল, ‘তুমি কি বলবে, রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?’
‘বলতে পারি এক শর্তে।’ লিসার ঠোটের কোণে হাসি। এত রহস্য করতে পারে মেয়েটা!
‘কী শর্ত?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল ফাহিম।
‘আজকের দিনটা যদি থেকে যাও—সব বলব।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফাহিম বলল, ‘থাক, কিছু বলতে হবে না।’ বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
‘আরে সত্যিই চলে যাচ্ছ নাকি? একটু দাঁড়াও–শোনো।’
ফাহিম দাঁড়াল।
লিসা এগিয়ে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে। ‘তুমি যা ভাবছ, তেমন কিছুই ঘটে নি।’ আবারো রহস্যময়ী হাসি তার মুখে।
ফাহিমের অস্বস্তি তবুও কাটল না।
কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই ফাহিমকে জড়িয়ে ধরল লিসা। তারপর আস্তে করে বলল, ‘আই উইল নেভার ফরগেট অ্যাবাউট দিস নাইট। থ্যাংকস ফর এভ্রিথিং।’
লিসার গভীর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল ফাহিম। দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
লিসা এল তার পিছে—দাঁড়িয়ে রইল অদূরে।
ফাহিম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। একবার তাকাল লিসার দিকে। কেমন মায়া কাড়া চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। সে কি কেঁদে ফেলবে না কি? কি বিচিত্র মানুষের মন। মাত্র একটি রাতের কয়েকটি ঘণ্টার পরিচয় অথচ মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা। ফাহিম চোখ সরিয়ে নিতেই বুঝতে পারল মেয়েটি এগিয়ে আসছে তার গাড়ির কাছে। এভাবে বসে থাকাটা আর সমীচীন হবে না। ফাহিম হঠাৎই গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল। রিয়ার ভিউ মিররে এক ঝলক দেখা গেল লিসাকে, হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।
স্নিগ্ধ সূর্য উকি দিয়েছে আকাশে অনেক আগেই। প্রকৃতির চারপাশে উঠে গেছে আলো। সুন্দর ঝলমলে একটি সকাল। এমন রোদেলা সকাল বহুদিন দেখেনি ফাহিম। কাল রাতে যে ঝড় বয়ে গেছে এই প্রকৃতিতে তার কোনো ছিটেফোঁটা চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বিশ্বপ্রকৃতি আশ্চর্যরকম শান্ত। প্রকৃতির রূপ এত তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে তার জানা ছিল না। মানুষের মনও কি তেমন, বদলে যায় প্রকৃতির মতই—সময়ে অসময়ে? প্রকৃতির এই রূপের সঙ্গে মানুষের মনের যথেষ্ট মিল আছে। প্রকৃতির বদলায় রং, মানুষের বদলায় মন।
ভাবতেই ভাবতেই আবাসিক এলাকার রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে পড়ল ফাহিমের গাড়ি। জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল সে। ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়ায় অন্যরকম একটা অনুভূতির ছোঁয়া যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে।
(সমাপ্ত)
পরিশিষ্ট – নির্বাচিত.কম এর বর্ষা উৎসবের জন্য পাঠানো মূল গল্পটির শেষ এখানেই হয়েছিল। দুজন অচেনা অদেখা মানুষের হঠাৎ পরিচয় এবং ঘটে যাওয়া কিছু রহস্যময় ঘটনার সমাপ্তি এভাবেই হয়েছিল। কিন্তু কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়ায় বুঝতে পারলাম তারা কেউ সন্তুষ্ট নয়। কোনো এক বিচিত্র কারণে আমার পাঠকেরা হ্যাপি এন্ডিং না হলে কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুণ্ণ হন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে প্রায়ই আমাকে শেষ পর্বের পরের পর্ব লিখতে হয়—হ্যাপি এন্ডিং সহ। এই গল্পেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। হ্যাপি এন্ডিং লেখা হয়েছে। পড়তে চাইলে চোখ রাখুন আগামীকাল এই সময়ে।

বোনাস পর্ব

আগের পর্ব

Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (পর্ব-২)

লিসার মনে হল যেন অনন্ত কাল ধরে, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ঝড়ের তাণ্ডব চলছে। যেন উন্মাদের চিৎকার তার কান জুড়ে ছড়াচ্ছে, আর অন্ধকারের শক্তিরা তার চারপাশের শূন্যতায় পাক খাচ্ছে আর চীৎকার করছে। অনন্ত সময় কেটে যাওয়ার পর, ধীরে ধীরে সে টের পেল, যে গোলমালটা কমে আসছে। তার কানের ভেতরের গর্জনটা আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে এল। অন্ধকারের মধ্যে গোঁত্তা খাওয়া বন্য শক্তিগুলোর তেজ কমে এল। ধীরে ধীরে হুলস্থূলটা শান্ত হয়ে এল। লিসার ঘোর পুরোপুরি কেটে গেল। ফাহিমের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে সে ভড়কে গিয়ে চুপ করে রইল।
ফাহিম আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল আর ঠিক তখনই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুমুল শব্দে আবার বজ্রপাত হল। বাজটি যেন পড়ল ওদের গাড়ির ঠিক উপরেই। বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি আর গগনবিদারী আওয়াজে লিসা ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। সে চকিতে পেছন থেকে সামনের প্যাসেঞ্জার সীটে গিয়ে বসে পড়ল।
লিসা ভয়ার্ত চোখে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না কোথায় আছে? সে অনিশ্চিত কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘আমরা এখন কোথায়?’
ফাহিম নেভিগেটর জুম করে দেখল কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না—এখন তারা ঠিক কোথায়। সে বলল, ‘এখন ঠিক কোথায় আছি বলতে পারব না, তবে পঞ্চাশ মাইলের মত এসেছি। আরো ৬৫ মাইল যেতে হবে। এখন এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে!’ ফাহিমের কণ্ঠে বিরক্ত এবং হতাশা ফুটে উঠল।
‘সরি তোমাকে এভাবে জোর করে নিয়ে আসাটা ঠিক হয় নি। কিন্তু আমি কী করব বলো?’
‘তো কী এমন জরুরী কাজ ছিল যে আজ রাতেই তোমাকে ফিরতে হল?’
লিসা নিশ্চুপ।
‘কথা বলছ না কেন?’ ধমকে উঠে জিজ্ঞেস করল ফাহিম।
লিসা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। এবং কাঁদতেই থাকল।
‘কাঁদছ কেন? কান্নার কী হল?’
মেয়েটির কান্না বেড়ে গেল আরো।
‘কী মুস্কিল—হোয়াই ইউ আর ক্রায়িং?’
কোনো উত্তর নেই।
‘হ্যোয়ার ইজ ইয়োর বয়ফ্রেন্ড?’
‘আই ডোন্ট নো।’
‘টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড?’
‘হি লেফট মি। আর একটা মেয়ের সাথে চলে গেছে।’
‘কোথায় চলে গেছে?’
‘আই ডোন্ট নো।’
ফাহিম হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইল সামনে।
‘আমি, ব্র্যাডলি আর ষ্টেসি—সাথে আরো কয়েকজন ফ্রেন্ড একসাথে বসেছিলাম।’
‘ব্র্যাডলি আর ষ্টেসি?’
‘ব্র্যাড আমার বয়ফ্রেন্ড। ষ্টেসি হচ্ছে সেই মেয়েটি, যার সঙ্গে ব্র্যাড ভেগেছে।’
‘ভেগেছে মানে কী? কীভাবে, কোথায় গেছে?’
‘একবার তো বলেছি—আই ডোন্ট নো।’
ফাহিম আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম—বৃষ্টি থামা তো দূরের কথা, কমারও কোনো লক্ষণ নেই। ফাহিমের নিজের বোকামির জন্য, নিজের উপর প্রচণ্ড রকমের বিরক্ত হতে থাকল।
‘আমরা তিনজন একই টেবিলে বসে ড্রিংক করছিলাম। হঠাৎ ব্র্যাড আর ষ্টেসি স্মোক করার জন্য বাইরে চলে যায়। আমি স্মোক করি না, তাই আমি যাই নি ওদের সাথে।’ এটুকু বলে চুপ করে রইল লিসা।
ফাহিম ঘুরে তাকাল লিসার দিকে—প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে।
‘ওরা আর ফিরে আসে নি। দশ মিনিট পরে আমি বাইরে স্মোকিং জোনে গেলাম—দেখলাম ওরা কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলাম, ফোন ধরল না। টেক্সটেরও রিপ্লাই দিল না। আমি প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম, কিন্তু ওরা আর ফিরে এল না।’
ফাহিম যা বোঝার বুঝে নিল। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, কী করে মেয়েটিকে দ্রুত পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাবে তার অ্যাপার্টমেন্টে। তার নিজেরও অনেক ক্লান্ত লাগছে। মাথাটা টনটন করছে—মাইগ্রেনের লক্ষণ। সে ঘড়ি দেখল, রাত ১টা বেজে ১৫ মিনিট। আরো প্রায় দেড় ঘণ্টা ড্রাইভ করতে হবে গন্তব্য পৌছতে। তারমানে ফিরতে ফিরতে ভোর ৫টা বেজে যাবে। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি, বাতাসের গতি কোনোটাই কমছে না। সে গাড়ির সীট পেছনে হেলিয়ে তার শরীরটা এলিয়ে দিল।
আবার নীরবতা নেমে এল দুই অপেক্ষমাণের চারিদিকের অন্ধকারে।
‘তুমি কি কখনো প্রেম করেছ?’ দীর্ঘ বিরতি দিয়ে লিসা প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
ফাহিমের নীরব ভাবনায় ছেদ পড়ল লিসার এমন প্রশ্নে। সে মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখল লিসাকে—সীটের ওপর দু’পা তুলে দিয়ে দু’হাত ভাঁজ করে জবুথবু বসে রয়েছে মেয়েটি। দুটি আয়ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফাহিম বলল, ‘কেন বলত?’
‘এমনিই—জানতে ইচ্ছে করল। তাছাড়া এভাবে কতক্ষণ চুপ করে থাকব। গত এক ঘণ্টায় তুমি আমার সঙ্গে একটি কথাও বল নি।’
‘তুমি ঘুমচ্ছিলে, তাই ডিস্টার্ব করি নি।’
‘ডাকলেই পারতে।’
‘নিয়ম নেই।’
‘কিসের নিয়ম নেই।’
‘ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জারকে ডেকে তোলার। গন্তব্যে পৌঁছে গেলে অবশ্য ভিন্ন কথা।’
‘আমি তো চোখ বন্ধ করে ছিলাম শুধু।’
‘হা হা হা, তাই?’ ফাহিম হেসে দিয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি বললে না কেন? তোমাদের বয়সী মেয়েরা তো সারাক্ষণ কথা বলে।’
‘আমার কি কথা বলার মত মেন্টাল সিচুয়েশন ছিল?’
‘তা অবশ্য একটা কথা।’ একটু চুপ করে থেকে ফাহিম আবার বলল, ‘এখন মন ভাল হয়েছে?’
‘ভাল হয় নি।’
‘তাহলে?’
‘চুপ করে থাকলে মন আরো খারাপ হচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে যা ঘটে গেছে—সে কথা আমি মনে করতে চাচ্ছি না।’
‘মনে না করাই ভাল।’
‘আচ্ছা সব ছেলেরাই কি এমন?’
‘কেমন?’
‘সুযোগ পেলেই প্রেমিকার হাত ছেড়ে অন্য একটা মেয়ের সাথে পালিয়ে যায়?’
ফাহিম এ কথার কোনো উত্তর দিল না।
‘আমার তো মনে হয় পৃথিবীর সব ছেলেরাই খারাপ।’
‘এভাবে বলাটা বোধ হয় ঠিক নয়।’ ফাহিম ঘুরে তাকাল মেয়েটির দিকে। কিছুটা রুঢ় কণ্ঠে বলল, ‘দোষটা কি ছেলেদের একার? আজ তোমার বয়ফ্রেন্ড তোমাকে ছেড়ে চলে না গেলে, এ কথা কি তুমি বলতে? তাছাড়া, সম্পর্ক গড়ে তোলার আগে যাচাই করে নিতে তুমি ভুল করেছ। দায় তো তোমারও আছে, নেই?’
লিসা চুপ করে রইল।
‘আমি কি একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?’ ফাহিম কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
‘পারো। অবশ্য আমি জানি প্রশ্নটা কী?’
‘তাহলে উত্তরটা দাও।’ একটু অবাক হয়ে ফাহিম বলল।
‘ইয়েস, উই হ্যাড সেক্স। হি টুক অ্যাওয়ে মাই ভার্জিনিটি।’
‘হা হা হা। হি টুক অ্যাওয়ে ইয়োর ভার্জিনিটি! রিয়েলি?’
‘হাসির কী হল? আমি কি ভুল কিছু বললাম?’
‘অবশ্যই ভুল বলছ। তুমি ছেলেটাকে একা দোষ দিচ্ছ কেন? তোমার দায় নেই? সে কি তোমাকে রেপ করেছে? তোমার প্রশ্রয় ছিল না?’
‘তুমি রেগে যাচ্ছ কেন?’
‘রেগে যাচ্ছি—বোকার মত কথা বলছ, তাই। তাছাড়া এটা আমার প্রশ্ন ছিল না। তোমার জীবনে আর কোনো ব্যক্তিগত কথা নেই?’
এবার মেয়েটি লজ্জা পেল, নিজের বোকামির জন্য। আগ বাড়িয়ে কেন যে এত কথা বলতে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
অস্বস্তিকর একটা নীরবতা নেমে এল আবার। কিছু সময় পার করে, ফাহিম হাত বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার সীটের পাশ থেকে ব্রাউন ব্যাগের ভেতর থেকে কয়েকটি গ্রানোলা স্ন্যাক-বার আর পানির বোতল বের করল। লিসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নাও। খিদে পেলে খেতে পারো।’
‘খিদে নেই।’
‘তোমার কি ধারণা আমি ধুতুরার বিষ মিশিয়ে দিয়েছি এটাতে?’
‘হোয়াট?’ কিছু না বুঝে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল লিসা।
ফাহিম দ্বিতীয়বার না সেধে নিজে একটি স্ন্যাক-বার খুলে খাওয়া শুরু করল। মচমচে স্ন্যাক-বার খাওয়ার শব্দে লিসা আবার তাকাল ফাহিমের দিকে। ফাহিম মৃদু হেসে একটি বার এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখলেই তো এটাতে কোনো কিছু মেশানো নেই। খেতে পারো। তাছাড়া আমি মানুষ খারাপ না। তোমার কোনো ক্ষতি যে আমি করব না, তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছ।’
কথা না বলে ফাহিমের বাড়ানো স্ন্যাকটি আলতো করে হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল লিসা।
আবার অপেক্ষা। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুতের ঝলকানি, বাতাসের ঝাপটা আর বড় বড় ফোটার অবিরাম বৃষ্টি মিলে মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে অপেক্ষমাণ একজোড়া মানব-মানবী।
88 ভিউ মিররে বহু দূর থেকে ভেসে একটা আলোর বিন্দু হঠাৎ করেই দেখতে পেল ফাহিম। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল। আলোক বিন্দু ধীরে ধীরে বড় হয়ে এক সময় বেশ বড় হয়ে গেল এবং আরো বড় হতেই ফাহিম বুঝতে পারল একটা গাড়ি মাত্রই তাদেরকে পাশ কাঁটিয়ে চলে গেল। পিছে পিছে আরো একটি গাড়ি চলে যেতেই ফাহিম ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারল, ঝড়ের তাণ্ডব বেশ কমে এসেছে। জানালার কাঁচ কিছুটা নামিয়ে দেখল, বৃষ্টিও আগের চেয়ে কম। সে খুশি খুশি চেহারা নিয়ে তাকাল লিসার দিকে—দেখল চুপচাপ ফোনে টেক্সট মেসেজ পড়ছে সে। ফাহিম বলল, ‘চল, সেকেন্ড ইনিংস শুরু করা যাক।’
লিসা অবাক হয়ে তাকাল।
‘দেখ নাই, দুটো গাড়ি আমাদের পাশ কাঁটিয়ে চলে গেল? ঐ দেখ…’ ফাহিম সামনের দিকে তর্জনী তাক করে দেখাল। এখনও একটা গাড়ির পেছনের লাল আলো দেখা যাচ্ছে—অল্প কিন্তু যথেষ্ট পরিষ্কার।
‘আর কতক্ষণ লাগতে পারে পৌছতে?’
‘সেটা তো এখনই বলা যাবে না। সামনের ওয়েদার কেমন কে জানে? তবে নেভিগেটরের সময় অনুযায়ী আমরা আরো ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব।’
‘আমাকে বাথরুমে যেতে হবে।’ লিসা কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল।
‘বাথরুমে কেন?’
‘বোকার মত প্রশ্ন তুমিও কর, দেখলে? বাথরুমে কেন যায় মানুষ?’
‘আচ্ছা, দেখি সামনের কোনো গ্যাস স্টেশন পেলেই এক্সিট নিয়ে নিব।’
‘অতক্ষণ তো দেরি করতে পারব না।’
ফাহিমের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই, অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল লিসা গাড়ির দরজা সামান্য খুলে কেমন কায়দা করে বসে দিব্যি তার প্রাকৃতিক কাজটি সেরে নিচ্ছে। এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে পরিপাটি করে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গাড়ি স্টার্ট দাও।’
ফাহিম রাগ করতে যেয়েও রাগ করল না। সে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘আই ক্যান্ট বিলিভ, ইউ রিয়েলি ডিড দ্যাট।’
‘হোয়াট?’ কাঁধ দুলিয়ে দুষ্টুমির হাসি হেসে লিসা বলল, ‘কোনো মেয়েকে পী করতে দেখনি কোনোদিন?’
ফাহিম অবিশ্বাস্যদৃষ্টিতে মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়ি সার্ট দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। সামনের কাঁচ ডিফ্রষ্ট হতেই উইন্ডশীল্ড উইপার চালু করে দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি নিয়ে উঠে পড়ল হাইওয়েতে।
ফাহিমকে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। বাতাসের বেগ আর বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমে এলেও, নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এক দীর্ঘ নীরবতা পার করে লিসা হঠাৎ ঘুরে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা দাও নি।’
‘কী প্রশ্ন?’ ফাহিম খানিকটা অবাক হয়ে জনতে চাইল।
‘তুমি কি কখনো প্রেম করেছ?’
‘হ্যাঁ করেছি।’
‘তোমার কাছে ভালবাসার সংজ্ঞা কী?’
ফাহিম তাকাল লিসার দিকে। লিসা উত্তরের অপেক্ষায়।
‘ভালবাসা এমন একটা জিনিস যার কোন সংজ্ঞা হয় না। এটি শুধু মাত্র অনুভূতির মাধ্যমে বুঝতে হয়। অন্য কোন উপায়ে প্রেম বা ভালবাসা বোঝা অসম্ভব। কারণ এটার অর্থ পরমভাব। আর যা কিছু সংজ্ঞার মাধ্যমে উত্তর দেওয়া সম্ভব, তা পরম হতে পারেনা।’
লিসার চোখে মুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। সে আর কিছু বলতে পারল না।
‘তো ভালবাসা বলতে তুমি কি বোঝ—তোমার সংজ্ঞাটি কি শুনি?’ এবার ফাহিম জানতে চাইল।
একটু চুপ করে থেকে লিসা বলল, ‘এক সময় আমারও মনে হত, ভালবাসা হচ্ছে অনুভূতির একটা ব্যাপার। এটি ব্যাখ্যার কোনো বিষয় না—অনুভব করার বিষয়। তবে এখন মনে হচ্ছে…’ থেমে গেল লিসা।
‘কী?’
‘নাহ—কিছু না।’ ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল লিসা।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব