দূর থেকে এলিনা আর ইরিন দেখল একটি এ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ইমরানের বাসার সামনের পার্কিং লটে। তাঁরা দুজনেই উৎকণ্ঠা আর শঙ্কা নিয়ে একবার তাকাল একে অপরের দিকে। তারপর দ্রুত এগিয়ে গেল সামনে। বাসার কাছাকাছি আসতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলো তাদের সামনে। পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও ওদেরকে ভিতরে যেতে না দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। টেনশনে ওদের দম বের হয়ে যাবার জোগাড় হলো।
এলিনা শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘What’s wrong officer?’
অফিসার কোনো উত্তর দেবার আগেই কমলা রঙের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন প্যারামেডিক একটা স্ট্রেচার বের করে এনে ঢুকাল এ্যাম্বুলেন্সে। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে রজার্স—জীবিত না মৃত তা বোঝা গেল না। এলিনা বিচলিত বোধ করল।
একটু পরেই বেরিয়ে এলো ইমরান।
এলিনা আর ইরিন তাকাল ইমরানের দিকে। তাকে দেখেও কিছু বোঝা গেল না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে।
ইমরানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এলিনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল ইরিনের দিকে। ‘তুই তোর বাবাকে সবকিছু বলে দিয়েছিলি তাই না?’
‘না মা—আমি কিছুই বলি নাই। Trust me—I didn’t say a single word.’
এলিনার ক্ষীণ সন্দেহ হলো যে ইরিন তার কাছ থেকে বিষয়টি লুকিয়েছে। তার ধারণা, ইমরান আর ইরিন আগে থেকেই কিছু একটা প্ল্যান করেছিল। এলিনার প্রচণ্ড রাগ হলো। হঠাৎ করেই রজার্সের জন্যে তার খারাপ লাগা শুরু হলো অথচ কয়েক মিনিট আগেও সে নিজেই রজার্সকে নিজের হাতে খুন করবে বলে উত্তেজিত হয়ে বাসায় ফিরে এসেছে। কী আশ্চর্য!
সাইরেন বাজিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে গেল ইমরানের দিকে। একটা কাগজ আর কলম বের করে দিল তার হাতে—একটি সাধারণ পুলিশ রিপোর্ট। ইমরান একবার দেখে নিয়ে সাইন করে ফিরিয়ে দিল অফিসারের হাতে। আবার কিছু কথা হলো তাদের মধ্যে। পুলিশ অফিসার বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ইমরান এগিয়ে গেল ইরিনের দিকে।
ইরিন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। ‘You alright baba?’
‘Yea, I’m just fine.’ ইমরান তার মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলল।
‘What happened?’ ইরিন জিজ্ঞেস করল আবার।
ইমরান কিছু বলল না। এলিনা এগিয়ে এলো সামনে। সে এতক্ষণ কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না—আসলে কী ঘটেছে। সে ইমরানকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে আমাকে বলবে?’
ইমরান কোনো উত্তর দিল না।
এলিনা তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল আবার, ‘কথা বলছ না কেন ইমরান?’ সে যথেষ্ট চিন্তিত। আবার বলল সে, ‘What did you do to him?’
উত্তর না দিয়ে ইমরান তাকিয়ে দেখল আশে পাশের বাসা থেকে বেশ কিছু প্রতিবেশী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ইমরানের বাসার পাশের বাসাতেই থাকে এক সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি—সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ঘটনা কী? ইমরান তাকে বোঝাল—তার গেস্টের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই। কথা না বাড়িয়ে তাকে গুড নাইট জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ইরিন এসে ধরল তার হাত।
‘Let’s go inside.’ ইরিনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল ইমরান। এলিনার দিকে একবারের জন্যে তাকালও না।
এলিনা কী করবে বুঝতে পারল না। কেমন অসহায় লাগছে তার। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল একা একা। তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ সামনের বাড়িটার দিকে। একসময় এটি ছিল তার নিজের বাড়ি—অনেক পছন্দের। নিজ হাতে সাজিয়ে ছিল সব কিছু। আজ এখানে সে অতিথি। ভাবতেই কেমন অস্বস্তি হতে লাগল তার। এলিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে তাকাল রাস্তার দিকে। রাত কত হয়েছে কে জানে। সে কি একা একা ড্রাইভ করে ফিরে যাবে? কিন্তু কোথায় যাবে সে? সব কিছু জানার পরে রজার্সের ঐ অভিশপ্ত বাসায় তো তার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল এলিনা ।
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার হাত ধরল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল ইরিন। ইরিন তার মায়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল ভিতরে।
…
৪৮ ঘণ্টা পরে রজার্সের জ্ঞান ফিরেছে। সার্জারি করে রজার্সের জেনিটালস রিপেয়ার করার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু সফল হয়নি সার্জনরা। বিকল যন্ত্র নিয়েই তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। বেঁচে আছে এটাই ভাগ্য।
এক সপ্তাহ পরে এলিনা একবার দেখা করে এসেছে রজার্সের সঙ্গে। এলিনাকে যেতেই হতো। রজার্সের সঙ্গে তার কিছু বোঝাপড়া ছিল।
এলিনা দেখল হাসপাতালের বিছানায় বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত রজার্স তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। সে এসে দাঁড়াল তার বিছানার পাশে। পৃথিবীর সমস্ত ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে এলিনা তাকাল রজার্সের চোখের দিকে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, ‘You’re lucky that Imran did not kill you but I would have killed you. I have no sympathy for a rapist; you deserved the pain and suffering.’
রজার্স নিশ্চুপ। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল দেয়ালের দিকে।
‘You scarred my girl for life. You took her life away. Now you pay for the consequences. Enjoy the rest of your life.’
এলিনা ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে। রজার্স দেয়ালের দিকেই তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে এলিনা বের হয়ে গেল রুম থেকে।
…
অনেকক্ষণ থেকেই লিভিং রুমে বসে আছে এলিনা। ইমরান ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল এনে দিয়েছে তাকে। পানি খেয়ে এলিনা চুপচাপ বসে রয়েছে। মাঝেমাঝে ইমরানের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু তার মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ইমরান ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। সে জানে এলিনা কিছু বলতেই এসেছে। কিন্তু এখনো কিছুই বলছে না অথবা বলতে পারছে না। সে নিজেও অপেক্ষায় আছে এলিনাকে কিছু কথা শোনাবার জন্যে। এলিনা শুরু করলেই সেও শুনিয়ে দেবে। তার প্রস্তুতি নেয়াই আছে।
দীর্ঘ সময় পার করে এলিনা বলল, ‘এভাবে ওকে ইনজুর্ড না করে পুলিশে দিলেই তো হতো? যা করার তারাই করত।’
‘পুলিশে দিলে কী হতো? তুমি জানো না—এ দেশে রেপিস্টের জেল হয় না। জেল হয় হোমলেস পিপলের—চুরি করে ধরা পড়ার অপরাধে। তাছাড়া এখানকার সিস্টেম ঐ সাদা চামড়ার কথাই বিশ্বাস করবে—তোমার আমার কথা না। উল্টো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার মেয়েটাকেই ফাঁসিয়ে দিত।’
এলিনা চুপ করে রইল।
‘নাকি তোমার কষ্ট হচ্ছে?’ ইমরান খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল।
‘কী বলছ তুমি?’
এবার উঠে দাঁড়িয়ে রিয়্যাক্ট করল ইমরান—উচ্চকণ্ঠে সে বলল, ‘Don’t you understand, that man raped my child? He’s a pervert, an evil pervert. That bastard hurt my daughter physically, mentally, and and took her childhood. My daughter, she is innocent. I could not take it, her suffering every day.’ বলতে বলতেই ইমরান অঝোরে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলে চলল, ‘কী দোষ ছিল ইরিনের? তিলে তিলে প্রতিদিন যে কষ্ট সে পাচ্ছিল—সেই কষ্ট মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি যা করার ভেবে চিন্তেই করেছি। জেল জরিমানা যাই হোক—সে নিয়ে আমি ভাবিনা। আমার কষ্ট শুধু একটাই—আমি আমার মেয়েকে রক্ষা করতে পারি নাই। আমি একজন ব্যর্থ বাবা!’
এলিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইমরানের মুখের দিকে। ভীষণ অবাক হলো—ইমরানকে এর আগে এভাবে কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি সে। কোনো বাবা যখন তার সন্তানের জন্য কাঁদে—সে কান্নায় কোনো খাঁদ থাকে না। ইরিনের জন্যে আপ্লুত হয়ে যেভাবে কাঁদছে ইমরান—দেখে খুব মায়া লাগল। ইমরানকে স্থির হবার সময় দিয়ে চুপচাপ বসে রইল এলিনা।
ইমরানের ক্রোধ একটু কমে আসতেই এলিনা বলল, ‘একটা কথা বলবে?’
ইমরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
‘তুমি জানলে কী করে? ইরিন তো তোমাকে কিছু বলেনি।’
‘না।’ ইমরান মাথা নাড়ল।
‘তাহলে?’
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না ইমরান। চুপ করে বসে রইল। তারপর উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। বাইরে তাকিয়ে থাকল যতদূর দৃষ্টি যায়। তার মনে পড়ল সেই রাতটির কথা—মাত্র কয়েকদিন আগের কথা।
সেদিন রাতে রজার্সের পাঠানো ভিডিও ক্লিপ দেখে আর রজার্সের হুমকি শুনে ইরিন যখন তার বাবাকে ফোনে বলেছিল তার ভয় লাগছে, ইমরান তখনই সব ফেলে দ্রুত ফিরে এসেছিল বাসায়। ঘরে ঢুকে দেরি না করে সে ছুটে গেল ইরিনের বেডরুমে। দূর থেকে দেখল, ইরিন ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ল্যাপটপটা ওর বুকের উপরে।
বিছানার কাছে এসে তার বুকের উপর থেকে আস্তে করে ল্যাপটপটা সরিয়ে ইরিনের গায়ের উপর ব্লাঙ্কেট তুলে দিল ইমরান। তারপর ল্যাপটপটা নিয়ে রাখল রিডিং ডেস্কের উপর। রাখার সময় স্ক্রিনে ইমরানের হাতের স্পর্শ লেগে হঠাৎ করেই ঘুমন্ত ল্যাপটপটা যেন জেগে উঠল—এবং স্থির হয়ে থাকা সেই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল—যেটা দেখেই ইরিন সংজ্ঞা হারিয়েছিল।
ইমরান একটু অবাক হলো। সে ভাবল, এই বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছুতেই কিউরিয়াস হয়—ইরিন কি কোনো পর্ন সাইটে ঢুকেছিল—কে জানে। একটু চিন্তিত মনে সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে তার মনে একটা খটকা বাঁধল। মনে হচ্ছে কিছু একটা সে দেখেছে—অস্বাভাবিক কিছু। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কি ভুল দেখল? অবশ্যই ভুল। তবুও নিশ্চিত হবার জন্য সে স্ক্রিনটা আবার খুলে মাউস প্যাডে আঙুল দিয়ে কয়েকবার নাড়ল আর তখনই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল আবার।
বরফের মতো জমে গেল ইমরান। বুকের ভেতরটা কে যেন মুচড়ে দিল মুহূর্তে। একি দেখল সে। এতবড় ধাক্কা সে তার জীবনে এর আগে কখনো খেয়েছে বলে মনে পড়ে না। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিছুতেই নড়তে পারছে না। সেকি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে তাও বুঝতে পারছে না।
বাস্তবে ফিরে আসতে ইমরানের বেশ খানিকটা সময় লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে একবার তাকাল ঘুমন্ত ইরিনের দিকে। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল তার বিছানার কাছে। বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খুঁজে খুঁজে ইরিনের ফোন থেকে সব টেক্সট মেসেজগুলো পড়ল। ধীরে ধীরে তার মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আপনা-আপনিই মুঠি বন্ধ হয়ে গেল তার। প্রতিহিংসায় চোখদুটো জ্বলে উঠল।
ইরিনের মাথায় হাত রেখে তার বিছানার পাশে বসে রইল পাথরের মত। একজন ভগ্নহৃদয়ের পরাজিত মানুষের প্রতিচ্ছবি যেন ইমরান।
বাস্তবে ফিরে এলো ইমরান। তার চোখ আবার ভিজে উঠেছে।
ইমরান বলল, ‘এটা আমার ব্যর্থতা। আমি আমার মেয়েকে প্রটেক্ট করতে পারিনি। এ দায় আমার—যা করার আমাকেই করতে হতো। প্রতিশোধ আমাকে নিতেই হতো।’
এলিনা ইমোশনাল হয়ে পড়ল।
‘কিন্তু তোমাকে আমি কোনোদিনই ক্ষমা করব না এলিনা।’
এলিনা চমকে তাকাল ইমরানের দিকে। কেমন কষ্ট আর ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমরান।
‘আমার মেয়ের জীবনে এত বড় একটা ক্ষতি কোনোদিনই হতো না—যদি তুমি ওর কাছে থাকতে। এই সব কিছুর জন্যেই তুমি দায়ী। You’re responsible for this mess… and I’ll never ever forgive you.’
এলিনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I deal with the blame and shame on a daily basis. লজ্জায় চলতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা। আমার দিন শুরু হয় এই ব্যথা নিয়ে। শেষও হয় এই ব্যথা নিয়ে। তুমি কী বুঝতে পারছ—আমি কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি? How long, how long do I have to deal with it?’
‘In rest of your life!’ বলেই উঠে চলে গেল ইমরান। তার আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।
এলিনা নীরবে কেঁদে চলল।
…
ইমরানের ল’ইয়ার জানিয়েছে—হাসপাতালের বিছানায় বসেই রজার্স স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করেছে। স্বীকার না করে অবশ্য তার উপায়ও ছিল না। তার করা ভিডিও, পাঠানো টেক্সট মেসেজ এবং ইমেইলে ছবি—সবই তার বিরুদ্ধে আলামত হিসেবে কাজ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ইরিনকে আইসক্রিমের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে তারপর ধর্ষণ করার বিষয়টি।
নিচের অংশটুকু রজার্সের জবানবন্দি থেকে নেয়া—!
ইরিনকে সংজ্ঞাহীন করে বেডরুমে নিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর–রজার্স ঘড়ি দেখল।
এলিনার শিফট শেষ হতে কম করে হলেও আরো তিন ঘণ্টা বাকি। তারপর বাসায় ফিরতে আরো পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট। সে ইরিনের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল তার নিজের রুমে। কালবিলম্ব না করে ফিরে এলো একটা ছোট হ্যান্ডিক্যাম আর ট্রাইপড নিয়ে। ক্যামেরাটি সেট করে ইরিনের শরীরের উপরে ফোকাস স্থির করল সে। স্টার্ট বাটনে চাপ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইরিনের কাছে। অতঃপর অতি সন্তর্পণে ইরিনের শরীর থেকে একটা একটা করে কাপড় খুলে ফেলল সে। মোবাইল ফোন দিয়ে প্রথমেই দ্রুত কিছু স্থির ছবি তুলে নিল মেয়েটির নগ্ন শরীরের। সময় ক্ষেপণ না করে ছোট মেয়েটিকে অচেতন অবস্থায় ইচ্ছেমত ধর্ষণ করল রজার্স। চরিতার্থ করলো তার বিকৃত কাম লালসার। ইরিনের নগ্ন শরীরটাকে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করল সে। একটা ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে একটা মায়াবী হরিণ ছেড়ে দিলে যেমনটা হয় ঠিক ঐরকম অবস্থা হলো ছোট মেয়েটির। সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেও তার শরীর মোচড় দিয়ে উঠল। কী পাষণ্ডটা!
ইরিনের জ্ঞান ফেরার আগেই রজার্স দ্রুত হ্যান্ডিক্যাম, ট্রাইপড সব লুকিয়ে ফেলল ক্লোজেটের ভিতরে। অতঃপর স্টিকি নোটে একটা মেসেজ লিখে ইরিনের হাতের মধ্যে গুজে দিয়ে আরো দ্রুততার সাথে সে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
…
শহরের একটি বিখ্যাত ক্রিমিনাল ল ফার্ম ইরিন এবং ইমরানের কেসটির দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ল’ইয়ার ইমরানকে নিশ্চিত করেছে রজার্সের সর্বোচ্চ সাজার ব্যাপারে। রজার্সের নাম এবং ছবি একজন সেক্স অফেন্ডার হিসেবে ইতিমধ্যেই ডাটাবেজে রেজিস্টার করা হয়েছে—ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে আমেরিকার সর্বত্র। প্রকৃতির কী পরিহাস—এক সময় ইরিনকে সে ভয় দেখিয়েছিল ইন্টারনেটে তার ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেবে বলে আর এখন তার নিজের ছবিই একজন দাগী ধর্ষক হিসেবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেটে। যতদিন বেঁচে থাকবে, একজন ধর্ষকের পরিচয় নিয়েই তাকে থাকতে হবে।
এদিকে ইমরানের কেসটিও তাঁরা সাজিয়েছে বিচক্ষণতার সাথে। মদ্যপ অবস্থায় রজার্স ইমরানকে আঘাত করতে চাইলে ইমরান ‘সেলফ ডিফেন্স’ করেছে এবং রজার্সকে প্রতিঘাত করেছে। তাছাড়া তার মাইনর চাইল্ডকে রেপ এবং ব্লাকমেইল করার ভিডিও এবং ইমেইল দেখার পর থেকেই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল তাই রজার্সের উপর তার আক্রোশ তৈরি হয়—বেড়ে যায় প্রতিহিংসা। সে চাইলে তাকে খুনও করতে পারত—কিন্তু তা না করে রজার্সকে শুধু আহত করেছে। ইমরানের সাজা দীর্ঘ মেয়াদী যাতে না হয় সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এলিনাও সাক্ষ্য দিয়েছে রজার্স মদ্যপ অবস্থায় তাকে প্রায়ই মারধর করত। ব্যস—রজার্স মোটামুটি ভালোভাবেই ফেঁসে গিয়েছে। এলিনা যখন বলছিল কথাগুলি—ইমরান সত্যিই অবাক হয়েছিল।
…
ইমরানের বাসার সামনে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দুজন পুলিশ অফিসার সাথে ইমরানের ল’ইয়ারকেও দেখা যাচ্ছে। ইমরানকে নিতে এসেছে। একজন পুলিশ ওয়াকিটকিতে কথা বলছে। আরেকজন ইমরানের ল’ইয়ারের সঙ্গে কথা বলছে।
ইরিন আর এলিনাকে জানানো হয়েছে—ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কাজেই এ নিয়ে খুব একটা চিন্তা করার দরকার নেই। ইমরানের পরামর্শেই তার ল’ইয়ার ইরিন আর এলিনাকে বলেছে। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা সমস্যা আছে—বুঝতে পারছে না কেউ।
ইরিন আর এলিনাও এসে দাঁড়িয়েছে পার্কিং লটে। ইরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। সে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না।
ইমরানকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, ‘I love you baba. I always have. Always will.’
‘I know sweetheart! You’re my dearest daughter.’ একটু থেমে ইমরান বলল, ‘I want to tell you that, you are an incredibly loving daughter. You’re a brave girl and your mother is a strongest person I know. You and your mother will get through this together!’
‘I’ll take care of myself. I’ll be fine. Do not worry about me.’ বলেই ইরিন আবার জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।
‘I will be back soon. Goodbye Erin.’
‘Goodbye baba’ ইমরানের হাতে একটা চুমু দিয়ে ইরিন তাকে ছেড়ে দিল।
ইমরান একবার তাকাল এলিনার দিকে। সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান কিছুই বলল না এলিনাকে। গাড়িতে উঠার ঠিক আগের মুহূর্তে সে ফিরে গেল এলিনার কাছে। ‘Take care of your child and yourself!’
ইমরান পুলিশের গাড়িতে উঠে বসল।
এলিনা আর ইরিন দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। অনিশ্চিত চোখে তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া গাড়ির দিকে।
(সমাপ্ত)
এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (শেষ পর্ব)
with
no comment

