পাঠক, আসুন এবার আমরা পরিচিত হই ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বোপরি মায়ের সঙ্গে।
ছেলেটির নাম আদনান। বয়স এগারো বছর। তার জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মহানগরী নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকাতে বসবাসরত এক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে। তার বাবা, শোয়েব খান—একজন স্থায়ী অভিবাসী, পেশায় ট্যাক্সিচালক। তার মা শিরিন খান, আমেরিকায় এসেছিলেন ভিজিট ভিসা নিয়ে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন অবৈধ অভিবাসী। কাজ করেন একটা হার্ডওয়ার স্টোরে ক্যাশিয়ার হিসেবে। ৫ম গ্রেডের ছাত্র আদনান একটি পাবলিক স্কুলে যায়। অঙ্ক তার প্রিয় বিষয়। ড্রাগন বল জি তার প্রিয় ভিডিও গেম।
পরিচয়ের পালা শেষ। আসুন আমরা মূল গল্পে ফিরে যাই।
এক পড়ন্ত বিকেলে হাডসন নদীর তীরে বসে ওপারে ম্যানহাটনের স্কাইলাইনের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায় শোয়েব। আমেরিকার কঠিন জীবনের জাঁতাকলে কাজ করতে করতে যখন হাঁপিয়ে ওঠে—তখন মাঝে মাঝে শিরিনকে নিয়ে এসে এই নদীর তীরে বসে আনমনে তাকিয়ে থাকে সে।
শিরিনও চুপ করে থাকে। শোয়েবের সান্নিধ্য তাঁর অনেক ভালো লাগে। এই দেশটিতে শোয়েবই একমাত্র আপনজন তাঁর।
এক পর্যায়ে শিরিনের উদাস দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠে শোয়েব, ‘শিরিন, চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। এভাবে আর কতদিন—একা একা আর ভালো লাগে না।’
শিরিন অবাক হয়ে তাকায় শোয়েবের মুখের দিকে। সে কী বলবে? তারও তো একা থাকতে ভালো লাগে না। কিন্তু যখনই পেছনের দিকে তাকায় সে—অনিশ্চয়তা জেঁকে ধরে তাকে। সে কী করবে?
ঠিক কত বছর আগে শিরিন এসেছিল এই স্বপ্নের ভূখণ্ড আমেরিকাতে তাঁর সঠিক সময় জানা না গেলেও, তাঁর স্বপ্নও ছিল অন্য সবার মতো অভিন্ন। সবার মত সেও স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন তারও একটা গ্রিনকার্ড হবে। ভেবেছিল এসে যখন এসেই পড়েছি—ব্যবস্থা একটা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থাই আসলে হয় না। এক সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কোনো উপায়ান্তর না দেখে স্থানীয় এক বাঙালি আইনজীবীর সহায়তায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে সে। কিন্তু পর্যাপ্ত এবং গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট এবং এভিডেন্স না থাকায় তার আবেদন গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। অন্য হাজারো ইমিগ্রান্টদের মতো ডিপোর্টেশন এড়াতে গা ঢাকা দেয় শিরিন। তারপর সেলস গার্লের কাজ জুটিয়ে নেয় একটা পরিচিত দোকানে। একসময় পরিচয় ঘটে গ্রিনকার্ডধারী শোয়েবের সাথে। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। ট্যাক্সি চালিয়ে ক্লান্ত শোয়েব সুযোগ পেলেই চলে যায় শিরিনের কাজের জায়গায়। শিরিনের সাথে সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে যায় শোয়েব।
‘তুমি তো সব জানোই শোয়েব। একটা অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাইছ কেন?’ বলে শিরিন।
‘জড়াতে চাইছি কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ছাড়া তুমিতো কোনো অপরাধ করোনি।’
‘এদেশে অবৈধভাবে থাকাটাই তো বড় অপরাধ।’ এটুকু বলে আবার আনমনে তাকিয়ে থাকে হাডসন নদীর পানির দিকে। শোয়েবও আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শিরিন আবার বলে, ‘এদেশের আইন সম্পর্কে তুমি ভালো করেই জানো—একবার ডিপোর্টেশনের অর্ডার হয়ে গেলে বিয়ে করেও কোনো লাভ নেই। আর তুমি সিটিজেন হলেও একটা কথা ছিল—তাতেও কিছু হতো বলে আমার মনে হয় না।’
‘এত ভাবছ কেন? যদি সত্যিই কিছু ঘটে যায়, সেটা তখন দেখা যাবে। কিন্তু এভাবে একা একা আমি তোমাকে কষ্ট করতে দেব না। আমি তোমার জীবনের ভাগীদার হতে চাই।’
‘আচ্ছা আমি ভেবে দেখি।’
‘ভাবা-ভাবির কিছু নেই। আমেরিকাতে তোমার মতো হাজার হাজার ইমিগ্রান্ট আছে—যাদের বৈধ কাগজ পত্র নেই। তারা থাকতে পারলে তুমি পারবে না কেন?’
শিরিন কিছু বলতে পারে না। আবারো অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
‘যা হবার হবে—আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল।’
এভাবেই দুজনে দুজনকে ভালো লাগা থেকে প্রেম—অতঃপর সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার শোয়েব আর শিরিন। বিয়ে করে শুরু করে সংসার। সময়টা তাদের ভালোভাবেই কেটে যায়। জন্ম হয় দুই সন্তানের। হেসে খেলে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। এগারো বছরের ছেলে আদনান আর মেয়ে দুই বছর বয়সী রাফিয়া।
বিয়ের পরপরই শিরিন আবেদন করেন বৈধ হবার জন্যে। কিন্তু আমেরিকার ইমিগ্রেশন আইনে একবার কেউ ডিপোর্টেশনের অর্ডার পেলে তা বাতিল করা খুবই দুরূহ। আর ধরা পড়লে আমেরিকা ছাড়তেই হবে এবং সেটাই ঘটেছে শিরিনের ভাগ্যে। ঘটনা হয়ত এতদূর গড়াতো না। কিন্তু ৯/১১ এর ঘটনা বদলে দিয়েছে সব কিছু। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার করছে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীকে। শিরিনকেও ধরা হলো এমনি একটা অভিযানে।
গত বসন্তের কোনো এক ভোরে—রাতের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি, আদনান আর রাফিয়া তখনও ঘুমিয়ে। মুহূর্তে উলট পালট হয়ে যায় তাদের আমেরিকার স্বপ্নের জীবন। ইমিগ্রেশন পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে হাতকড়া পরিয়ে তাদের মা শিরিনকে নিয়ে যায় নিউ জার্সির এক ডিটেনশন সেন্টারে। কারণ আর কিছু না—সেই পুরনো ডিপোর্টেশন অর্ডার। সেখানেই তাকে থাকতে হবে শিরিনকে যতদিন না তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। আমেরিকায় একবার কোনো অভিবাসীকে ডিপোর্ট জরা হলে দশ বছরের আগে তাঁর পক্ষে আমেরিকায় এন্ট্রি করা সম্ভব হয় না।
শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছোট ছোট দুটো ছেলে-মেয়ে মাকে ছাড়া থাকবেই বা কী করে? একা কাজ আর বাসার কাজ সামলে ছেলেমেয়ে দুটোকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না শোয়েব। সে আবার ল’ইয়ার ধরল। অনেক চেষ্টা তদবির করল। ছোট বাচ্চা দুটির দোহাই দিল—কিন্তু আইনের মন গলাতে পারল না। তাদের একটাই কথা, যে অবৈধ সে অবৈধ। সে ভালো হলেও—খারাপ হলেও। এখানে মানবিকতা দেখানো সুযোগ নেই।
নিয়মানুসারে শিরিনকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। শিরিনের চলে যাওয়া যখন নিশ্চিত, উপায়ান্তর না পেয়ে শোয়েব বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়—আদনান আর রাফিয়াকে শিরিনের সঙ্গে দেশে পাঠিয়ে দেবে। সে তখন ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টকে অনুরোধ করল—তাদের বাচ্চা দুটোকে তাদের মায়ের সঙ্গে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁর অনুরোধ রক্ষা করল। তারাই সব ব্যবস্থা করে দিল যাতে একই ফ্লাইটে মা এবং সন্তানেরা বাংলাদেশে যেতে পারে। এবং সেভাবেই সব কিছু ঠিক করা হয়।
এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তারপরেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বেদনাদায়ক ঘটনা।
ইমিগ্রেশন থেকে সিদ্ধান্ত হলো কুয়েত এয়ারওয়েজের একটা ফ্লাইটে মায়ের সাথে বাচ্চারাও যাবে। ডিটেনশন সেন্টার থেকে শিরিনকে নেয়া হলো সোজা এয়ারপোর্টে। ইতোমধ্যেই আদনান আর রাফিয়া বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে উঠে পড়েছে বিমানে। যেহেতু পূর্বেই কাগজ-পত্রে নির্দেশনা ছিল তাই আদনান আর রাফিয়ার ইমিগ্রেশন আর বোর্ডিং করতে কোনো ঝামেলা হলো না।
কিন্তু ঝামেলা হলো অন্যখানে। কুয়েত এয়ারওয়েজ ভিসার জটিলতার কারণে শিরিনকে বোর্ডিং করাতে রাজি হলো না। শিরিনের দায়িত্ব ছিল যেই ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে সে শিরিনের পাসপোর্টে লে-ওভারের জন্যে ট্রানজিট ভিসা লাগাতে ভুলে যাওয়ায় এই বিপত্তি দেখা দিল। শিরিনকে আবার ফেরত পাঠানো হলো ডিটেনশন সেন্টারে।
এদিকে বাচ্চারা যথারীতি পরিকল্পনা অনুসারে বিমানে উঠে পড়েছে। সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু মায়ের দেখা আর মেলে না। বিমানে বসে তারা অপেক্ষা করতে থাকে তাদের মায়ের জন্যে।
সব কিছু ঘটে গেল শোয়েবের অজান্তেই। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না।
আদনানের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। সে কী করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমান আকাশে উড়াল দিল। ছোট মানুষ—ভয়েই হোক আর বুঝেই হোক কান্নাকাটি না করে ভেবেছে পরে খোঁজ নিবে। ওর বদ্ধমূল ধারণা ছিল ওর মা এই বিমানেই আছে—সম্ভবত অন্য কোথাও তাকে বসিয়েছে, যেহেতু তাকে ডিপোর্ট করা হয়েছে। হয়ত তার জন্য ভিন্ন নিয়ম। যদিও তার কাছে পরিষ্কার নয় যে তাদের মায়ের অপরাধটা কী এবং কেনই বা তাকে চলে যেতে হচ্ছে। আদনানের নিজের মধ্যেও এক ধরনের হীনমন্যতা গ্রাস করল। সে কান্নাকাটি না করে কীভাবে মায়ের সন্ধান বের করা যায় সে চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল।
কাঁদতে কাঁদতে এবং ক্লান্তিতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাফিয়া। শুধু আদনানের চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ করেই সে যেন পূর্ণ বয়স্ক এক মানুষ হয়ে গেল সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক কুয়েতে নেমেই তাঁর বাবার সাথে কথা বলবে। সে নিশ্চয়ই মায়ের কী ঘটেছে বলতে পারবে।
ইতিমধ্যেই এয়ার হোস্টেস বিমানের সব যাত্রীর তালিকা থেকে খুঁজে খুঁজে দেখল অন্য কেউ বাংলাদেশে যাচ্ছে কিনা এবং একজনকে পেয়েও গেল। তাকে সব কথা জানানোর পর সে আগ্রহ নিয়ে আদনান আর রাফিয়ার সঙ্গে বাকিটা পথ ওদের সাথেই থাকল।
কুয়েত এয়ারপোর্টে অবতরণের পর বাংলাদেশি ভদ্রলোক আদনানের কাছ থেকে ওর বাবার ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করল শোয়েবকে। অপরপ্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই, আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা, হোয়াট হ্যাপেন্ড টু মামি? শি ইজ নট উইথ আস। শি ডিড নট বোর্ড ইন দিস প্লেন। উই আর গোয়িং এলোন। হোয়্যার ইজ মামি?’
শোয়েব কিছু বুঝে উঠতে পারল না। আদনান কী বলছে? সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলছ, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।’
আদনান আবার তাকে পুরো বিষয়টা খুলে বলল। সব শুনে এবং বুঝতে পেরে শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানতে চাইল, ‘হাউ ইজ রাফিয়া ডুইং? ইজ শি ওকে?’
‘নো শি ইজ নট—শি ইজ ক্রায়িং অল দ্য টাইম। শি ইজ জাস্ট এ লিটল গার্ল। শি ইজ কিপ অন ক্রায়িং অ্যান্ড শি ডিড নট ইট এনিথিং। আই ডোন্ট নো হোয়াট টু ডু।’ বলেই আদনান আবার কাঁদতে থাকল।
শোয়েব মূর্তির মতে বসে রইল ফোন হাতে। সে কথা বলতে ভুলে গেল। আদনান আবার বলল, ‘প্লিজ টক টু রাফিয়া।’ আদনান রাফিয়ার হাতে ফোন দিল।
ফোন হাতে নিয়ে রাফিয়া অবাক করা কাণ্ড ঘটাল। কোনো ধরনের কান্নাকাটি না করে বাসা থেকে সে তাঁর বাবা যখন বাইরে থাকে তখন যেভাবে কথা বলে ফোনে ঠিক সেভাবেই কথা বলল।
‘কেমন আছ আম্মু?’
‘গুড।’
‘শোনো আম্মু, ইয়োর মামি একচুয়ালি মিসড দ্য ফ্লাইট, দ্যাটস হোয়াই শি কুডন’ট গো উইথ ইউ। বাট শি ইজ গোয়িং ইন দ্য নেক্সট ফ্লাইট। হোয়েন ইউ এরাইভড—শি উইল বি দেয়ার। ডোন্ট ক্রাই, ওকে আম্মু?’ মেয়েকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে ভেবে পেল না। বাধ্য হয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিল।
‘ওকে।’ রাফিয়া বলল।
ভদ্রলোক অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছিল। তাঁর ফোনে ইন্টারন্যাশনাল রোমিং চার্জ উঠছে কিনা কিংবা সে চিন্তায় চিন্তিত কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা অনুভব করে সে বিষয়টি মেনে নিল। মানুষের বিপদ বলে কথা। আর এমন ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এভাবে বিপদে পড়েছে। সে ফোন কেটে দেবার আগে শোয়েবের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। এটুকু ভদ্রতা তো তাকে করতেই হবে। সে বলল, ‘ভাই আপনি একেবারেই ভাববেন না। আপনার বাচ্চাদেরকে আমি সহি সালামতে পৌঁছে দেব। আমার ফোন নাম্বারটা দিচ্ছি আপনাকে। আপনি দেশে জানিয়ে দিন। যারা ওদেরকে নিতে আসবে, আমার ফোনে কল দিলেই হবে। আপনি বরং ওদিকটা সামলান।’
‘আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দিব ভেবে পাচ্ছি না। আল্লাহ সত্যিই মহান। আপনি না থাকলে আমার বাচ্চা দুটোর কী হতো আমি ভাবতেই পারছি না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার ভালো করবেন।’
‘ঠিক আছে ভাই রাখছি। আপনি টেনশন করবেন না। আমি ঢাকায় ল্যান্ড করা মাত্রই আপনাকে ফোন করে জানিয়ে দিব।’ আর কথা না বাড়িয়ে ভদ্রলোক লাইন কেটে দিলেন।
তাদের সাথে শিরিন নেই। একথা শোনার পর শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে। অবাক করা বিষয় হলো, সেখান থেকে তাকে জানানো হলো, এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শোয়েবকে সে কথা জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করে নাই। এর চেয়ে অমানবিক ঘটনা আর কী হতে পারে!
এর পরে কেটে গেল আরো দশ দিন। জীবনে প্রথমবারের মতো মা-বাবা ছাড়া সম্পূর্ণ কিছু অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কাটল আদনান আর রাফিয়ার। পরিবেশ খাবার, বাংলা বলতে এবং বুঝতে না পারা—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটল বাচ্চা দুটোর।
দশ দিন পর শিরিনকে পাঠানো হলো বাংলাদেশে।
মাকে কাছে পেয়ে আদনান আর রাফিয়া যেন জীবন ফিরে পেল। মাকে কাছে পেয়েছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশে তো ওদের ভালো লাগে না। আমেরিকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা ছেলে মেয়েদের জন্য সেটা একটা সমস্যাই তো। তবুও মন্দের ভালো অন্তত তাদের মাকে তারা কাছে পেয়েছে। খারাপ লাগলেও মেনে নিচ্ছে।
কাজ থেকে ফিরে শোয়েব প্রায় প্রতিদিনই একবার করে ফোন দেয় দেশে। কথা বলে স্ত্রী-ছেলে আর মেয়ের সাথে। আদনানের সঙ্গে কথার সময় হলে আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি আমেরিকায় ফিরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট টু গো ব্যাক বাবা। ’
শোয়েব চুপ করে থাকে। সে কী বলবে? দীর্ঘ সময় পার করে সে আস্তে করে বলে, ‘আমিওতো চাই বাবা। আমিও তো চাই।’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে শোয়েবের। সে আর কিছু বলতে পারে না।
একবার ডিপোর্টেশন অর্ডার পেলে দশ বছরের মধ্যে আর আমেরিকার ভিসার জন্যে আবেদন করা যায় না। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। শোয়েব, শিরিন, আদনান আর রাফিয়া—সবাই অপেক্ষা করছে। একদিন হয়তো সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তখন ওরা সবাই আবার একসঙ্গে হবে।
নিশ্চয়ই একদিন সব অপেক্ষার অবসান হবে। আমরাও অপেক্ষায় থাকি সেদিনটির।
(সমাপ্ত)
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

