সব শুনে সফিক চুপ করে রইল। সে আর তেমন কিছুই বলতে পারল না। আর কীইবা বলবে। তার যা জানার ছিল জেনে গেছে। সে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে। শারমিন আস্তে করে বলল শুধু, ‘তারপরে আরও অনেকগুলো ইন্সিডেন্ট ঘটেছে। আমাদের সাথে প্রায়ই সেসব নিয়ে সমস্যা হতো। এখনো হচ্ছে।’
শারমিন একে একে আরো কয়েকদিনের ঘটনা বলে গেল।
একদিন—শারমিন লিভিং রুমের সোফাতে বসে অপেক্ষা করছিল জেসমিনের জন্য। সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ১২টা বেজে ২৫ মিনিট। আরো কিছুক্ষণ পর জেসমিনের গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই দেখল শারমিন বসে আছে লিভিং রুমে। সব সময়ের মতোই ওপরে উঠে যাওয়ার মুখে শারমিন উঠে দাঁড়িয়ে ওর সামনে গেল। জেসমিন বুঝতে পারল বড় বোনের জবাবদিহিতার সামনে এবার তাকে দাঁড়াতে হবে। শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, You are late again. তুই জানিস বাবার শরীর ভালো না। And you’re keep causing him to suffer. Why Jazz? কেনো এমন করছিস?’
‘Do you have to interrogate me every time I get home?’ জেসমিনের কণ্ঠেও বিরক্ত প্রকাশ পেল।
‘No, I don’t have to, if you back home on time.’ শারমিন আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন রাত ১২টা বেজে ৪০ মিনিট। সে জিজ্ঞেস করল, ‘So why are you late?’
‘I had dinner with a friend.’
‘And then?’
‘Nothing.’
‘তোর কি মনে হয় আমি ব্রেষ্ট ফিডিং বেবি? আমি কিছুই বুঝি না? You will be in big trouble one day, I’m telling you.’
জেসমিন সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটে গেল ডাইনিং টেবিলের কাছে। গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেতে খেতে লক্ষ করল টেবিলে অনেক রকমের খাবার সাজানো রয়েছে। তখন মনে পড়ল আজ রাতে ওর ডিনার করার কথা ছিল সবার সাথে। রহমান সাহেব অপেক্ষায় থাকেন, প্রতি রাতে তার মেয়ে দুটিকে নিয়ে এক সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। বেশির ভাগ সময়ই অবশ্য জেসমিনকে পাওয়া যায় না। আবার বাসায় থাকলেও সে তার মতো কোনো প্যাকেট ফুড ফ্রিজ থেকে বের করে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খেয়ে নেয়। টেবিলে থাকলেও সে তার মতো কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারপর উঠে চলে যায়। দু’একটি যা কথা হয় ঐ শারমিনের সঙ্গেই।
টেবিলে এত খাবার দেখে জেসমিন বলল, ‘Wow! Looks good.’
‘তোর ডিনার করার কথা ছিল আমাদের সাথে। বাবা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন।’
‘That’s ok, sis. I’ll have it tomorrow or some other day.’
‘You are going out of control. You are crossing your limit you know that?’
‘Don’t start acting like dad. I’m sick of it.’ বলতে বলতে জেসমিন সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
শারমিন তাকিয়ে রইল অসহায় দৃষ্টিতে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কী করলে জেসমিনকে বশে আনা যাবে। মেয়েটা দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছে কেন?
আরেকদিনের ঘটনা। এক শনিবারের দুপুর। রহমান সাহেব তার দু’মেয়েকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। তার মনটা বেশ ভালো। সে সব সময় চায় মেয়ে দুটি তার আশে পাশেই থাকুক। ওরা পাশে থাকলে তার খুব ভালো লাগে।
সবাই চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। জেসমিন অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য, কিন্তু তার বাবা কী বলবেন সেই চিন্তায় সে কিছুটা দ্বিধান্বিত। কথাটা কি সে বলবে না কি বলবে না। অবশেষে কোনো রকম ভণিতা না করে সে বলে ফেলল, ‘I’ll sleep over at my friends’ house tonight. I need some help with the homework. So, don’t wait for me.’
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে একবার তাকালেন জেসমিনের দিকে। তারপর তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিন জানে জেসমিনের সব কথা এখন আর বিশ্বাস করা যায় না। অথচ আমেরিকায় ছেলেমেয়েরা সাধারণত মিথ্যে বলে না। যা বলার সরাসরি বলে। এমন হতে পারে, বাবাকে ভয় পেয়ে সে ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে। সে বিরক্ত চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে।
রহমান সাহেব শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘রাতে অন্য কারো বাসায় থাকাটা আমার পছন্দ নয়। রাত যতই হোক বাসায় ফিরবে, তাছাড়া প্রতি উইকএন্ডেই তোমাকে কেনো বাইরে যেতে হবে জেসমিন? You are not a boy!’
‘I can’t go out just because I’m not a boy? That’s discrimination!’ জেসমিন প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল।
‘জেসমিন, তোমাকে আগেও বলেছি, আবারো বলছি। তোমার চলাফেরা আচরণ দিনকে দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি চাই না তোমার বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হোক, সমস্যায় পড়ো।’
‘Dad, I told you, don’t worry about me. I’m not a little kid anymore. I’m quite grown up.’
‘Not quite enough to make your own decision. I’ll have to restrict your privilege, if you keep doing it and not listen to me.’
‘Why do I have to always listen to you? Just because you are my dad? Can’t I have my own choice? Why? Why can’t I have my freedom? Am I not adult enough to make my own decision?’
‘তোমার ফ্রিডম তুমি নিজেই নষ্ট করেছ। ফ্রিডম মানে এই নয় যে তোমার যা খুশি তাই করবে। যখন খুশি বাসায় ফিরবে, যখন খুশি বেরিয়ে যাবে। সব ফ্যামিলিতেই কিছু কিছু নিয়ম থাকে। যতক্ষণ তুমি এ বাড়িতে থাকছ, এ বাড়ির কিছু নিয়ম তোমাকে মেনে চলতে হবে। No exception.’
‘Ok, then I’ll have to move out with a friend or maybe I’ll find a room at the dorm and I will live on my own.’
‘কি বললে? What did you say?’
‘You heard me.’
‘এত বড় বাড়ি থাকতে তুমি ডর্মে গিয়ে থাকবে?’
‘Only if you force me to.’ বলেই জেসমিন টেবিল থেকে উঠে চলে গেল।
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলেন। শারমিন অসহায় চোখে তাকাল জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। তারপর উঠে এসে দাঁড়াল তার বাবার পাশে।
এসব কথা শুনে সফিকের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কথা বলতে বলতে শারমিন বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সফিক ওর কাঁধে হাত রাখল। শারমিন একটু ধাতস্থ হতেই এক সময় সফিক বলল, ‘আসলে কি জানো? ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের প্রচুর সমস্যা হয়। বিশেষ করে আমেরিকায়। ওদের লাইফটা অন্য আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো হয় না। এজন্যেই বাবা-মায়ের একত্রে থাকাটা খুবই জরুরী।’ একটু থেমে সফিক আবার বলল, ‘জেসমিনের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু কী করা যায় তাই ভাবছি?’
প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে রহমান সাহেবের বাগানে পানি দেয়াটা অভ্যাস। শারমিনদের বাসার পেছনে বিস্তর জায়গায় হরেক রকমের শাক-সবজি, ফল আর ফুলের বাগান। এগুলোর পরিচর্যা রহমান সাহেব আর শারমিনই করে থাকে। আসলে বাগান করার শখ ছিল রহমান সাহেবের স্ত্রী নাসরীন জাহানের। তার আগ্রহ এবং ইচ্ছেতেই বাড়ির পেছনের এই বাগানটি তৈরী হয়েছিল। বাগান ভর্তি ফলফুলের সমাহার দেখে এখন হয়ত বোঝা যাবে না যে, এগুলোর পেছনে একজন মানুষের কতটা শ্রম আর মমতা থাকতে পারে। নাসরীন জাহান প্রতিদিন সকাল আর বিকেলবেলাতে বাগানে কাজ করতেন। গাছ রোপণ করা, আগাছা পরিষ্কার করা, গাছে পানি দেওয়া, মাটি বদলানো, সার দেওয়া, কীটনাশক ছিটানো—সব কিছুই নিজের হাতে করেছেন। প্রতি বছর বসন্তের শুরুতেই ফুলের চারা, মাটি আর ঘাস কিনে নিয়ে এসে নিজ হাতেই সব কিছু করতেন নাসরীন জাহান। রহমান সাহেব তার স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় বাগানে কাটাতেন। অভ্যাসটা রয়ে গেছে এখনো। তাছাড়া, বাগানে এলেই তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। বাগান পরিচর্যা করতে করতে নাসরীন প্রায়ই বলত, ‘গাছ শুধু লাগালেই হয় না, যত্ন করতে হয়, গাছের সাথে কথা বলতে হয়, তবেই না ফুলে-ফলে-পল্লবে ভরে ওঠে উদ্ভিদগুলো! তখন খুব ভালোভাবেই বোঝা যায় যে, গাছেরও প্রাণ আছে৷ বাগানের কাজের জন্য কে কতটা সময় দেয় বা ভালোবাসে তা যে কোনো বাগান দেখলেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায়৷ তাছাড়া, বাগানের কাজ বা সবুজ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মানুষের স্ট্রেস লেভেলও অনেক কমে যায়।’
সফিক দূর থেকে দেখল রহমান সাহেব বাগানে পানি দিচ্ছেন। সে এগিয়ে গেল তার কাছে। রহমান সাহেব ঘুরে তাকালেন। পানি দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ড্রাইভিং শেখা কেমন হচ্ছে? টেস্ট দেবার জন্য রেডি?’
‘আর কয়েকদিন প্র্যাকটিস করলেই হয়ে যাবে। আমি অবশ্য রেডি কিন্তু শারমিন বলছে আর একটু প্রাকটিস করা দরকার।’
‘প্যারালাল পার্কিং শিখেছ ঠিকমতো?’
‘জি। ঐ প্যারালাল পার্কিং-এই একটু ঝামেলা হচ্ছে।’
‘হুমম।’
এটুকু কথাবার্তার পরে আর কোনো কথা হয় না। রহমান সাহেব একটু সামনে এগিয়ে অন্য গাছে পানি দিতে থাকেন। সফিক এগিয়ে দাঁড়াল তার কাছাকাছি। কিন্তু কিছু বলল না। রহমান সাহেব একবার ঘুরে দেখলেন ওকে, চেহারা দেখে বুঝে নিলেন, সফিক হয়তো কিছু বলতে চায়। তিনি বললেন, ‘কিছু বলবে?’
সফিক কোনো রকম ভণিতা না করেই বলল, ‘না মানে, আমি ভাবছিলাম, জেসমিনকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?’
রহমান সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। যেভাবে পানি দিচ্ছিলেন সেভাবেই পানি দিতে থাকলেন।
সফিক একটু সময় নিয়ে বলল, ‘খুঁজলে নিশ্চয়ই উপযুক্ত বাঙালি ছেলে এখানে পাওয়া যাবে। আমেরিকার সিটিজেনশীপ আছে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করার ছেলের তো অভাব হবার কথা না।’
‘ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে? তাছাড়া গ্রাজুয়েশন করতে হবে, ক্যারিয়ারের ব্যাপার আছে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘আর যে বিয়ে করবে তার ইচ্ছেও তো থাকতে হবে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘ছেলে মেয়েরা বড় হলে বাবা মায়ের কথা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার বোধহয় আর কোন মূল্য থাকে না। তাদের জগৎ আলাদা হয়ে যায়।’ রহমান সাহেবের কণ্ঠে হতাশা ফুটে উঠল। তিনি গাছে পানি দেয়া বন্ধ করে দিলেন। তার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়েছে।
সফিক বলল, ‘কেনো, থাকবে না কেনো? শারমিন তো আপনার কথা মতো দেশে গিয়েই বিয়ে করেছে। তাহলে জেসমিন করবে না কেনো?’
‘শারমিনের কথা আলাদা। বাংলাদেশে জন্ম, ছোটবেলা থেকে এদেশেই বড় হয়েছে ও। কিন্তু তারপরেও দেখো, ও কিন্তু বাংলাদেশি কালচার কিংবা ট্র্যাডিশনকে বিসর্জন দেয়নি। আবার আমেরিকান কালচারকেও দূরে সরিয়ে রাখেনি। দুটো কালচারের সমন্বয়ে ও বড় হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ওর কারণে কখনোই আমাদেরকে কোনো কষ্ট পেতে হয় নি। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙ্গুলতো আর সমান হয় না তাই না?’
‘তাতো ঠিকই।’
শারমিনকে নিয়ে রহমান সাহেবের সত্যিকার অর্থেই কোনো কষ্ট নেই। ওকে কখনো কিছুই বলতে হয় নি। কি কারণে কে জানে, শারমিন খুব ছোট বেলা থেকেই বাঙালি সংস্কৃতিটাকে বেশ ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে। বাংলাদেশিদের প্রতিটা অনুষ্ঠানেই সে যায়। সক্রিয়ভাবে অংশও নেয়। বসন্ত, বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস সহ সব দিবসগুলোতেই সে সুন্দর করে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে যায়। দেখতে কী ভালো লাগে। ভাবতে ভাবতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে আসে।
সফিক আরো কিছু বলতে চায়। সে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ইতস্তত কণ্ঠে বলল, ‘আমি কি একবার জেসমিনের সঙ্গে কথা বলে দেখব?’
রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন সফিকের দিকে। মৃদু হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘তুমি আর কী বলবে? এদেশে বর্ণড ছেলেমেয়েদের কথার ভঙ্গীই আলাদা। ওর এটিচুড তোমার ভালো নাও লাগতে পারে।’
‘সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি অত সহজে কিছু মনে করি না।’
রহমান সাহেব আর কিছু বললেন না। সফিক কি দাঁড়িয়ে থাকবে না চলে যাবে বুঝতে পারল না।
‘কী ব্যাপার, তোমরা এতক্ষণ কী কথা বলো? ডিনার দেয়া হয়েছে, ভেতরে এসো।’
হঠাৎ শারমিনের ডাকে তারা দুজনেই ঘুরে তাকাল। সফিক অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এখনো তো সন্ধ্যাই হয় নি, বিকেলের রোদ কেবল মাত্র ফিকে হতে শুরু করেছে, এখনই ডিনার? কিন্তু ঘড়ির সময় দেখে সে আঁতকে উঠল। প্রায় আটটা বাজে। সময় অনুযায়ী তো এখন রাত। আজব দেশ তো!
মিক্সড কালচার (পর্ব-৫)
with
no comment

