সোমবার থেকে শুক্রবার, সপ্তাহের এই পাঁচদিন শারমিনকে অফিসে যেতে হয়। শুধু শনি আর রবি এই দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। শনিবার সকালটা রান্না, লন্ড্রি করা, ঘর গোছানো ইত্যাদি কাজেই চলে যায়। শনিবার বিকেল আর রবিবারে যতটুকু সম্ভব সফিককে নিয়ে সে ঘুরতে যায় বাইরে। সফিক বেচারা একা একা গৃহবন্দির মতো অবস্থা। শুধু টিভি দেখে আর কত সময় কাটে। রহমান সাহেবও কাজ থেকে ফিরে তার স্টাডি রুমেই থাকেন বেশিরভাগ সময় আর জেসমিন কখন বাসায় থাকে কখন থাকে না, সেটা বোঝার কোনোই উপায় নেই। একই বাসার মধ্যে এতোগুলো মানুষ থাকছে অথচ কেমন যেন ডিসকানেক্টেড—কারো সঙ্গে কারো কোনো সংযোগ নেই। এই কী আমেরিকার জীবন? এই জীবনের জন্য বাংলাদেশে থেকে সফিক এতো হা-হুতাশ করেছে? শুধু সফিক কেন, বাংলাদেশের প্রতিটা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষই হা-হুতাশ করে। যেন জীবনে বেঁচে থাকতে একবার আমেরিকা যেতে না পারলে জীবনের বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। বেশিরভাগ প্রবাসী কিংবা অভিবাসী তাদের প্রবাস জীবন নিয়ে সুখী নয়, নানান মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং জীবনের একটা বিশাল এবং লম্বা সময় পর্যন্ত নানান বর্ণ বৈষম্যে এবং চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বাইরে থেকে প্রবাস জীবন যতটাই রঙিন দেখা যাক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে—কেবলই ধূসর! এসব ভাবতে ভাবতে সফিকের মনটা বিষণ্ণতায় ভরে ওঠে।
শারমিন বুঝতে পারে সফিকের মনের অবস্থা। তাই তো কাজ থেকে ফিরেই কোথাও যেতে হলে সফিককে সে সাথে করে নিয়ে যায়। ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়। নিয়ে যায় কোথাও না কোথাও। তারই ধারাবাহিকতায় সফিককে নিয়ে শারমিন আজকে এসেছে ডালাসের বিখ্যাত বোটানিক গার্ডেনে। এখানে চারিদিকে সবুজের সমারোহ। নাম না জানা হরেক রকমের ফুলের বাগান। বাগানের ভিতর শত শত ফুলের বিছানা। মাঝে দিয়ে পর্যটক এবং ফুলপ্রেমীদের জন্য হাঁটার পথ। পথের দু’পাশে সারি বাঁধা টিউলিপ বাগান। তারমাঝে নানা প্রজাতির রংবেরংয়ের শত শত টিউলিপ সারি সারি ফুটে রয়েছে। কোনোটি টকটকে লাল, কোনোটি কমলা, আবার কোনো বাগান বেগুনি, ফিরোজা, মেরুন, হলুদ কিংবা সাদা টিউলিপের। পথের পাশে যেন নানা প্রিন্টের গালিচা বিছানো। এক এক সারি এক এক রঙের টিউলিপে সাজানো, বিশাল মাঠ জুড়ে টিউলিপ অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়েই চলেছে। এত সুন্দরভাবে বাগানের চারদিকটা সাজানো হয়েছে, সত্যিই অকল্পনীয়। বাতাসে ফুটন্ত ফুলের সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।
শারমিনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ নয়নে ঘুরে ঘুরে দেখছে সফিক। সফিকের কিছু ছবিও তুলে দিল শারমিন। দেশে সবাইকে পাঠাবে। বেলা একটু পড়ে আসতেই শারমিন আর সফিক বসল গার্ডেনের সবুজ ঘাসের মধ্যে। কার্পেটের মতো মোলায়েম ঘাসের মধ্যে বসে থাকতে বেশ লাগছে সফিকের। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাঁটিয়ে বিভিন্ন কথার ফাঁকে একবার জেসমিনকে নিয়েও কিছু কথা হলো। জেসমিনের প্রসঙ্গ আসতেই সফিক খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আচ্ছা তোমরা জেসমিনকে কিছু বলো না কেন? ওতো দেখি খুব উড়নচণ্ডী হয়েছে।’
‘উড়নচণ্ডী মানে?’
‘অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল! এই যে প্রায় প্রতিদিন রাতে বন্ধুদের সাথে বাইরে যাচ্ছে। অনেক রাত করে বাসায় ফিরছে। নিজের ইচ্ছে মতো চলছে। তোমাদের কারো কোনো কথা শুনে না—মানেও না। ও যে এই ফ্যামিলির একজন মানুষ সেটাই তো মনে হয় না। কেমন ছাড়া ছাড়া একটা ব্যাপার লক্ষ করছি সব সময়।’
শারমিন একটু সময় চুপ করে থেকে বলল, ‘জেসমিনের ১৮ বছর পার হয়েছে। ওকে শাসন করার অধিকার আর আমাদের নেই। আর শাসন করলেই বা ও শুনবে কেনো বলো? দেশটা যে আমেরিকা!’ শারমিনের কণ্ঠে এক ধরনের হতাশা আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠল।
’দেশটা আমেরিকা হয়েছে তো কী হয়েছে? আর ১৮ বছর হয়েছে বলেই কী যা খুশি তাই করবে নাকি? আমরা এ বয়সটা পার হয়ে আসি নি?’
শারমিন চুপ করে রইল।
‘সেদিন আবার দেখলাম একটা নিগ্রো ছেলের সাথে। ওই নিগ্রোটাও কি ওর ফ্রেন্ড নাকি?’
সফিকের কথার ধরণে শারমিন হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে বলল, ‘সফিক, এখানে কালোদের নিগ্রো কিংবা নিগার বলাটা শোভনীয় নয়—ভীষণ অফেনসিভ। মারাত্মক অপরাধ। অনেকটা গালির পর্যায়ে পরে। ভুলেও আর কখনো বলবে না—বলবে আফ্রিকান আমেরিকান কিংবা ব্ল্যাক। শুধুই কালো।’ পশ্চিমে কালো অভিবাসীদের নিগ্রো কিংবা নিগার না বলে ‘আফ্রিকান আমেরিকান’ বলে সম্বোধন করা হয়। ঠিক তেমনি সমকামীদের ‘ফ্যাগ’ বা ‘হোমো’ না বলে ‘গে’ বা ‘লেসবিয়ান’ বলে। শারমিন সুন্দর করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলল সফিককে।
সফিক অবাক চোখে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিনের কথা সে কি কিছু বুঝল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। সে বলল, ‘তবে যাই বলো না কেনো, এভাবে ছেলে বন্ধুদের সাথে অবাধ মেলা মেশাটা ওর কিন্তু একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। একটা বাঙালি মেয়ে হয়ে…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই শারমিন বলল, ‘ও তো বাঙালি মেয়ে নয় সফিক। জেসমিন বাঙালি বাবার আমেরিকান মেয়ে। বাঙালি ঘরে জন্ম হলেই তাকে বাঙালি হতে হবে, এ থিওরি তো এ দেশে চলে না।’
শারমিনের কথা সফিককে সন্তুষ্ট করতে পারল না। কিন্তু সে আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। বুঝতে পারল না কী বলবে।
শারমিন আবার বলল, ‘তাছাড়া ওকে কিছু বলা হয় না তা তো নয়। বলতে গিয়েই তো বাবার একবার স্ট্রোক করল।’
সফিক অবাক হয়ে তাকাল। দেশ থেকেই সে শুনে আসছিল তার শ্বশুরের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। এখানে আসার পর শারমিনও মাঝে মাঝে বলেছে। কিন্তু তার আসল কারণ কখনোই তাকে বলা হয় নি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সফিক আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছিল আমাকে বলবে?’
শারমিনের এখনো মনে আছে সেদিনটার কথা। একদিন রহমান সাহেব তার দোতলার স্টাডি রুম থেকে হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সকে। তারা সম্ভবত ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসেছে। অ্যালেক্সের একটা হলুদ রঙের জিপ আছে, সেটাতে করে জেসমিনকে সে বেশিরভাগ সময় নামিয়ে দিয়ে যায়। উইকএন্ডের আউটিং-এও সে নিয়ে যায়। তো ঐদিন পড়ন্ত বিকেলে রহমান সাহেব দেখলেন গাড়ি থেকে নেমে অ্যালেক্স জেসমিনের কোমর ধরে আলিংগন করছে। দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে মনে হতেই পারে তারা একে অপরকে গভীরভাবে চুম্বন করছে। এটা দেখে রহমান সাহেবের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে নেমে এলেন ওপর থেকে। দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘Hey you, get off your hands of her. What do you think you are doing? How dare you touch my daughter?’ বলতে বলতে তিনি এগিয়ে গেলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সের দিকে। কাছাকাছি গিয়ে রাগান্বিত ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘জেসমিন ভেতরে যাও।’
জেসমিনের মধ্যে ভেতরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে আরো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব উচ্চস্বরে বললেন, ‘I said go inside. Now.’ এবার তিনি এগিয়ে গেলেন অ্যালেক্সের আরো কাছে। তার মুখের উপর আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘Get out of my face, right now. Out. You never ever come to my house. And I don’t want to see your face, ever again.’
বিব্রত অ্যালেক্স অপ্রস্তুতভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। এমন অপমান সে হয়তো তার এই বিশ একুশ বছরের জীবনে কখনোই হয় নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল সে এবং ভয়ও পেল বেশ। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তার গাড়িতে উঠে বসল অ্যালেক্স।
জেসমিন ঘুরে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আহত কণ্ঠে বলল, ‘No dad, no. You can’t do that to him. What’s wrong with you?’
অ্যালেক্স গাড়ি স্টার্ট দিতেই জেসমিন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অনুনয়ের স্বরে বলল, ‘Alex, I’m sorry. Please don’t listen to him. Don’t go like this.’
কিন্তু জেসমিনের কথায় কর্ণপাত না করে অ্যালেক্স দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে গেল বাসার সামনে থেকে।
জেসমিন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অ্যালেক্সের চলে যাওয়ার দিকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়াল রহমান সাহেবের মুখের দিকে। উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘Dad, he is my friend. You can’t talk to him like that. You just can’t walk up and assault someone.
জেসমিনের কথার ভঙ্গিতে রহমান সাহেব বেশ অবাক হলেন। এতটা সাহস আর স্পর্ধা এ মেয়ে পেল কোথায়? জেসমিন গলার স্বর নিচু না করেই আবার বলল, ‘You have no right of doing this. How dare you?’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে অধিকতর উচ্চস্বরে বললেন, ‘And how dare you’re talking to me like that?’ বলেই এক পা এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন জেসমিনের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় জেসমিন তথমত খেয়ে গেল। চোখ বড় করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার উনিশ বছরের জীবনে এই প্রথম তার গায়ে কেউ হাত তুলল। জেসমিন হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। মুহূর্তেই তার চোখ ভরে গেল অভিমানের কান্নায়। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার বাবার মুখের দিকে।
রহমান সাহেব সহসাই বুঝতে পারলেন তিনি কী করেছেন। তার এত আদরের ছোট মেয়ে, যাকে কোলে পিঠে করে এত বড় করেছে আর সেই কিনা আজ তার গায়ে এভাবে হাত তুলল। তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন। তার হাতটা কেমন কেঁপে উঠছে।
জেসমিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে।
হঠাৎই রহমান সাহেবের চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। বুকের বাম পাশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। চাপ চাপ ব্যথা। এই ব্যথা এতটাই তীব্র যে, মনে হলো হাতির পা বুকে চাপ দিলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি। তার শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে তিনি পার্কিং লটের ফ্লোরে পড়ে গেলেন।
মিক্সড কালচার (পর্ব-৪)
with
no comment

