রাতে খাবার টেবিলে বসে সফিকের ভ্রমণ সংক্রান্ত দু’একটি কথা বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়লেন রহমান সাহেব। তিনি এমনিতেই কম কথার মানুষ। প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বার্তা খুব একটা বলেন না। টুকটাক যা কথা হয়, তা ঐ বড় মেয়ে শারমিনের সঙ্গেই।
সফিক রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বা, আপনার শরীরটা কি এখন একটু ভালো?’
‘শরীর ভালই আছে। তবে মনের অবস্থা ভালো না। আমি ভীষণ ক্লান্ত। এখানে আর ভালো লাগে না। অনেক বছর তো হলো।’
রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে শারমিন বলল, ‘তোমার শরীর ভাল নেই বাবা। একবার একটা স্ট্রোক করেছে। কতবার বললাম, কিছুদিন রেস্ট নিয়ে তারপর কাজে ফিরো। তা না…’
‘চাইলেই কি আর রেস্ট নেয়া যায়রে মা। দেশটা যে আমেরিকা। কাজ নেই তো, ভাত নেই। কাজের বিনিময়ে খাদ্য। ফুড ফর ওয়ার্ক। হা হা হা।’
শারমিন কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘কেনো, আমার কাজে বুঝি ভাত আসবে না?’
রহমান সাহেব হাসলেন, কোনো উত্তর দিলেন না।
সফিক বলল, ‘না না, এ শরীরে আপনার আর কষ্ট করে কাজে যেতে হবে না। এখন তো আমি চলেই এসেছি। সব দায়িত্ব আমার। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না।’
রহমান সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবেক্ষণ। সবে তো মাত্র এলে। সবকিছু আগে দেখো। দেশটাকে আগে জানো।’
সফিক বিজ্ঞের মতো আবার বলল, ‘আমেরিকা সম্পর্কে আর কি জানবো? এ দেশ সম্পর্কে এখন রাস্তার টোকাইরাও ভাল জানে। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের নাম হয়তো অনেকে জানে না, কিন্তু ট্রাম্পের নাম ঠিকই জানে। হা হা হা…’
এরপর আর তেমন কোনো কথা হলো না। সফিক কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাল। একবার তাকাল রান্নাঘরের দিকে তারপর তাকাল ওপর তলার দিকে। তারমধ্যে কিঞ্চিত অস্থিরতা লক্ষ করা গেল। কিছু একটা ব্যাপার তাকে ভাবাচ্ছে। অনেকক্ষণ হলো সে এসেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার শাশুড়ির সঙ্গে তার দেখা হয় নি। সে কি বাসায় নেই, বাইরে অফিসে না অন্য কোনো কাজে তাও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সেও মুখ ফোটে জিজ্ঞেস করে নি। অবশেষে সে জিজ্ঞেস করেই বসল, ‘ইয়ে, আম্মা কোথায়? তাকে দেখছি না। শরীর-টরীর খারাপ নাকি?
সফিকের এমন হঠাৎ প্রশ্নে রহমান সাহেব অপ্রস্তুতভাবে তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিনও ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাল তার বাবার দিকে। তারপর সফিকের দিকে ঘুরে বলল, ‘রান্না কেমন হয়েছে? এই প্রথম তুমি আমার রান্না খাচ্ছো। কিছু বললে না যে?’ শারমিন কথা ঘুরিয়ে নেবার চেষ্টা করছে সেটা স্পষ্ট বোঝা গেলেও সফিক আর কিছু বলল না। সে উত্তর দিল, ‘রান্না অতি চমৎকার হয়েছে। কিন্তু কেমন যেন একটা গন্ধ সবকিছুতেই।’
‘গন্ধ লাগছে?’
‘না মানে কেমন অন্যরকম যেন। ঠিক স্বাদ পাচ্ছি না।’
‘অস্বাভাবিক কিছু না। ধুলা-বালি, ঘাম আর নর্দমার গন্ধ থেকে এসে এখানকার গন্ধ তো একটু অন্যরকম লাগবেই। কয়েকদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তা যা বলেছ। হা হা হা।’ সফিক বোকার মতো হেসে সায় দিল।
…
প্রায় মধ্য রাত।
শারমিনের রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। সফিককে নিয়ে শারমিন তার রুমে এসে ঢুকল। বিছানার পাশের টেবিলে হরেক রকম নাম-না-জানা ফুলের মিশ্রণে তৈরি বেশ বড় একটি ফুলের তোড়া ফুলদানিতে সাজানো। সুন্দর পরিপাটি বিছানার ওপরে ছড়িয়ে আছে কিছু গোলাপের পাপড়ি। ঘরময় ফুলের মিষ্টি গন্ধে ম ম করছে। নাসারন্ধ্রে ঘ্রাণটা পৌঁছুতেই কেমন যেন পুরো শরীরে শিহরণ খেলে গেলো সফিকের। পরিবেশটা কেমন স্বর্গীয় অনুভূতিতে অন্য এক রঙ ধারণ করেছে–সেই রঙের নেই কোনো নাম, কল্পনাতেই যার অস্তিত্ব। স্যাক্সোফোনের একটা রোমান্টিক সুর ভাসছে মৃদু তালে। সফিক অবাক বিস্ময়ে পুরো বিষয়টা লক্ষ করে শারমিনের দিকে ঘুরে বলল, ‘তুমি তো দেখি বাসর ঘর বানিয়ে রেখেছো?’
শারমিন মৃদু হেসে বলল, ‘বিয়ের পর তোমার সাথে দেশে থেকেছি মাত্র তিন সপ্তাহ। তারপর দু’বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। আজকের রাত তাই আমার কাছে বাসর রাতের মতোই।’
‘তা যা বলেছ। সত্যি আমেরিকার এই ভিসা দেয়ার সিস্টেমটা খুবই খারাপ। শরীর এবং মনের উপর ভীষণ চাপ পড়ে। বিয়ের পরে স্বামী স্ত্রীকে কেনো এতদিন অপেক্ষা করতে হবে?’
‘ঠিক বলেছ। সিস্টেমটা খুবই খারাপ।’
সফিক কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই শারমিন তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার ওপরে চড়ে বসল। ঘটনার আকস্মিকতায় সফিক হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে তার দু’হাত প্রসারিত করে বুকে টেনে নিল তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীকে। সফিক আর শারমিন, দুটি মানুষ এই প্রথম অনুভব করল, জীবনে কত গান আছে, কত ফুল আছে, কত রূপ আছে, কত গন্ধ আছে। শারমিনের মুখে মিষ্টি হাসি। কোনো রকম ভূমিকা না করে সফিকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল সে। মুহূর্তে ডুবে গেল একে অন্যের মাঝে—এক অতল গহ্বরের শূন্যতার ভেতর।
ডালাসের উত্তরে অ্যাডিসন* নামক শহরের একটি আপস্কেল রেস্টুরেন্টে উদ্দাম মিউজিকের সাথে তালে তাল মিলিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে উচ্ছল বেশ কিছু তরুণ তরুণী। সেই দলে জেসমিনকেও দেখা যাচ্ছে সাথে অ্যালেক্স সহ আরো বেশ কিছু আমেরিকান এবং মেক্সিকান বন্ধু।
*অ্যাডিসনকে বলা হয়ে থাকে ‘দি রেস্টুরেন্ট ক্যাপিটাল অফ টেক্সাস’, এখানে দুইশত’র উপরে রেস্টুরেন্ট আছে। মাত্র ৫ বর্গ মাইল জায়গা নিয়ে ছোট্ট এই শহরটিতে প্রায় ১৬,০০০ মানুষের বসবাস। তবে নাইট লাইফ এবং বিভিন্ন ধরনের রেস্টুরেন্টের কারণেই এই মিউনিসিপালিটি শহরের চাহিদা ডালাসবাসীদের কাছে অনন্য। তাছাড়া রয়েছে পার্ক এবং রিক্রিয়েশন সেন্টার। ‘ফোর্থ অফ জুলাই’তে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই শহরের যে ফায়ারওয়ার্কস হয় তা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও পর্যটকরা এসে থাকে।
আমরা ফিরে যাই গল্পে। জেসমিন কিছুক্ষণ পর পর উচ্চ স্বরে হেসে উঠছে। কয়েকজন ছেলে চেষ্টা করছে নাচের তালে তালে জেসমিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার কিন্তু অ্যালেক্স তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখছে সেদিকে। এক পর্যায়ে সে জেসমিনের একটা হাত ধরে অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মিউজিকের সাথে তাল মিলিয়ে নেচে চলল।
সফিকের চোখে ঘুম নেই। এদিকে প্রায় ভোর হতে চলেছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না। রাতের খাবার পর পরেই ঘুমিয়ে পরেছিল একবার—অনেক চেষ্টা করেও বসে থাকতে পারছিল না। এখন তার খেসারত দিচ্ছে। তার দু’চোখে ঘুমের রেশ মাত্র নেই। শারমিন ঘুমাচ্ছে তার পাশে। একবার ইচ্ছে হলো ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিতে—পর মুহূর্তেই ভাবল থাক। সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। অনেকক্ষণ স্পষ্ট চোখে তাকে দেখল, তার আকর্ষণীয় শরীর, রূপ, ভঙ্গিমা, যাবতীয় একাকার হয়ে সফিকের মাথা এলোমেলো করে দিল। সে এক হাত শারমিনের শরীরের ওপর দিয়ে টেনে আনল নিজের কাছে।
অস্বস্তিতে শারমিনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে চোখ খুলে দেখল সফিক তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে দুষ্ট হাসি। শারমিন ঘাড় ঘুরিয়ে সাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সময় দেখল—৪টা বেজে ২০মিনিট। ঘুরে তাকাল সফিকের দিকে। প্রশ্ন বোধক চিহ্ন দিয়ে ভ্রূ নাচাল। সফিক হাসল, কিন্তু কিছু বলল না।
শারমিন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘ঘুম আসছে না, না? দিন রাতের পার্থক্য। কিন্তু আমাকে তো ঘুমাতে হবে, সকালেই কাজ।’
‘এতদিন পরে আমি এলাম, আরেকটা দিন ছুটি নিতে পারলে না?’
‘পারতাম, তবে ইচ্ছে করে নেই নি। তুমি তো আর চলে যাচ্ছো না। বছরে ছুটি পাই মাত্র দশ দিন। বাবার স্ট্রোকের সময় চার দিন ইউজ করেছি। আজ একদিন, পাঁচদিন। বাকী পাঁচদিন রেখেছি তোমাকে নিয়ে ফ্লোরিডা যাবো বলে।’
‘মাই গড, একেবারে গুনে গুনে ছুটির ব্যবহার?’
‘এটা বাংলাদেশ নয় মিস্টার, আমেরিকা। We don’t have that kind of luxury here. উপায় কী বলো?
সফিক কী বলবে ভেবে পেল না। তাকিয়েই রইল শারমিনের মুখের দিকে।
শারমিন আবার বলল, ‘তুমি এক কাজ করো। লিভিং রুমে গিয়ে টিভি দেখো। ঘুম পেলে চলে এসো। দেখো, আবার কিন্তু আমার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করো না।’
‘সে গ্যারান্টি অবশ্য দিতে পারছি না।’ সফিকের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
শারমিন চোখ ঘুরিয়ে তাকাল সফিকের দিকে।
সফিক হেসে ফেলল, ‘না না ভাঙ্গাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো।’ বলেই রুম থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
‘শোন, নিচের টেবিলে খাবার রাখা আছে। খিদে পেলে খেয়ে নিও। গুড নাইট।’
‘গুড নাইট।’
লিভিং রুমের সোফায় বসে সফিক টিভি ছেড়ে দিল। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না কী দেখবে? কোন চ্যানেলে কী দেখাবে তাও তো তার জানা নেই। সে একটার পর একটা চ্যানেল বদলাতে থাকল। কিছুক্ষণ চ্যানেল বদলিয়ে সে স্থির হলো মুভি চ্যানেলে। একটা লাভ মেকিং সিন হচ্ছে। সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে নারী-পুরুষের রতিক্রিয়া চলছে। সফিক স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল টিভি পর্দায়। কোথায় যেন একটা শব্দ হলো। সে দ্রুত চ্যানেলটি বদলিয়ে তাকাল এদিক-ওদিক। না কেউ নেই। সে আবার ফিরে এলো আগের চ্যানেলে। দৃশ্যটি নেই। সে আরো এক চ্যানেল পেছনে গেল, না নেই। আরো কয়েকবার চ্যানেল সামনে পেছনে করে ক্ষান্ত দিল।
টিভি দেখতে দেখতে হঠাৎ কেমন খিদে পেল সফিকের। রাতের খাবারের পর শারমিন তাকে কিচেনের কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিয়েছে। সে উঠে গিয়ে কিচেন থেকে বিস্কিটের টিন নিয়ে এলো। কয়েকটি বিস্কিট খেয়ে এক গ্লাস পানি খেল সে। সময় কাটছে না একেবারেই। কিছু সময় পার করে সে এদিক ওদিক তাকাল। হঠাৎ লক্ষ করল লিভিং রুমের বড় জানালা দিয়ে গাড়ির আলো এসে পড়েছে। উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল সফিক। সামনের পার্কিং লটে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল এবং মুহূর্তেই থমকে গেল।
অন্ধকারে আবছা মত দুটি ছায়া যেন একে অপরের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। কেমন পরিচিত লাগছে ছায়া দুটিকে।
সফিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না—এ সে কী দেখছে?
মিক্সড কালচার (পর্ব-২)
with
no comment

