Ki-Ghotechilo-Las-Vegase

কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-২)

শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে নায়লার দিকে।
নায়লা নির্বিকার।
কিছুক্ষণ পর সে তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কি বললে?’
নায়লা গলার স্বরে কোন পরিবর্তন না এনে একই রকম ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘আপনি তো সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। ফ্যামিলির জন্যে আপনার সময় কোথায়? তাই সে ডিসিশন নিয়েছে সাথে আর থাকবে না।’
‘আমার সাথে থাকবে না মানে? আমার সাথে থাকবে না তো কার সাথে থাকবে?’ হঠাৎ করে শাহেদের কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।
‘কার সাথে থাকবে সেটা আমি কী করে বলব?’ নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখেই নায়লা শাহেদের প্রশ্নের উত্তর দিল।
‘তাহলে আমার সাথে যে আর থাকবে না, সেটা কী করে জানলে?’
‘আমাকে বলেছে।’
‘কবে বলেছে?’
‘দিন-তারিখ তো মনে করে রাখি নাই দুলাভাই।’
‘আর কী বলেছে শুনি?’
‘থাক, সেগুলো শুনলে আপনার ভাল লাগবে না।’
‘তবুও শুনি। বলো।’
‘আর বলেছে আপনার শরীর থেকে নাকি কিসের গন্ধ বের হয়। সে লাইক করে না। অবশ্য এরকম অনেকেই আছে, গন্ধ সহ্য করতে পারে না।’
এমন ধরণের কথা শুনে শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে নায়লার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার গায়ে গন্ধ?’
নাভিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে শাহেদের পাশে গিয়ে ওর শরীরের গন্ধ নেবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘কই না তো!’
শাহেদ এবার নায়লাকে ডেকে বলল, ‘এই তুমি এদিকে আসো।’
‘থাক দুলাভাই বাদ দেন।’
‘বাদ দিব কেন। তুমি নিজেই পরীক্ষা করে দেখো—আসো।’
অনিচ্ছা স্বত্বেও নায়লা উঠে এসে শাহেদের পাশে দাঁড়াল।
‘করো, পরীক্ষা করো।’
নায়লা শাহেদের ঘারের কাছে নাক নামিয়ে গন্ধ নেবার চেষ্টা করল।
‘কি, গন্ধ পেলে?’
‘আমার কাছে তো লাগছে না।’
‘তাহলে?’
‘আসলে আপুর নাকটা না একটু বেশি সেন্সিসিটিভ। আম্মার মতো।’
‘আর ইউ সিরিয়াস? সত্যি করে বলতো, শায়লা বলেছে যে আমার গায়ে গন্ধ?’
‘তাহলে কি আমি বানিয়ে বলছি?’ বলতে বলতে নায়লা ফিরে গিয়ে বসল ওর চেয়ারে।
‘শায়লা এখন কোথায়?’ নায়লার দিকে তাকিয়ে শাহেদ সরাসরি জানতে চাইল।
নায়লা খাওয়া শুরু করেছিল। খেতে খেতেই উত্তর দিল, ‘মাশুক ভাইয়ের সাথে লাস ভেগাস গেছে।’
নাভিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কার সাথে লাস ভেগাস গেছে?’
‘মাশুক ভাইয়ের সাথে।’ হঠাৎ করেই নায়লার রাগ গিয়ে পড়ল এখন নাভিদের উপর। ‘নাভিদ, তুমি বোধ হয় ইদানীং কানে একটু কম শুনছো। ইউ শুড কনসাল্ট এন ইএনটি স্পেশালিষ্ট।’
বিষয়টা নাভিদের কাছে স্পষ্ট নয়। সে আবারো প্রশ্ন করল, ‘না সেটা ঠিক আছে, কিন্তু মাশুক ভাইয়ের সাথে যাবে কেন?’
‘কেন যাবে তার আমি কী জানি? আমাকে কেন জেরা করছ?’
নাভিদ আর কথা না বাড়িয়ে তাকাল শাহেদের দিকে।
শাহেদ চিন্তিত মুখে প্লেট নিয়ে উঠে পড়ল। বেসিনের সিঙ্কে প্লেট রেখে হাত ধুয়ে সে ফিরে এসে বসে থাকল চুপচাপ। হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল শাহেদ। কোন কিছুই সে মেলাতে পারছে না।
নায়লা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর প্রসঙ্গটা বদলে দেবার জন্যে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, একটা পান খাবেন? আপনার পছন্দের মসলা দেয়া পান এনেছে নাভিদ।’
শাহেদ কোনো উত্তর দিলো না। যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে রইল। নায়লার দিকে তাকালও না। তার মানসিক অবস্থা বোঝার কোন উপায় নেই।
নায়লা নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, আপনার মন কি বেশি খারাপ হয়েছে?’
শাহেদ এবারো কোন উত্তর দিল না।
নাভিদ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘এখন কী করবেন শাহেদ ভাই?’
শাহেদ একদৃষ্টিতে নাভিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল নায়লার দিকে। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিল, ‘খুন করব।’
নায়লার চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। যেন খুব মজার একটা বিষয় ঘটবে, এমন ভাব নিয়ে সে শাহেদের দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে খুন করবেন দুলাভাই?’
‘সেটা সময় হলেই বুঝতে পারবে। তবে আমি নিজের হাতে কাজটা করব না। আই উইল হায়ার এ প্রফেশনাল হিটম্যান। ভাড়াটে খুনি দিয়ে আমি তাকে পরপারে পাঠিয়ে দেবো।’
নাভিদের আগ্রহের সীমা রইল না। সে শাহেদের দিকে একটু ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, ‘আপনার সন্ধানে কি ভাড়াটে খুনি আছে শাহেদ ভাই?’
‘না নাই। তবে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না।’
‘আমার সন্ধানে আছে। আপনি চাইলে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
‘তোমার সন্ধানে আছে মানে? তুমি চেনো?’ নায়লা অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তাকাল নাভিদের দিকে।
নাভিদ নায়লার দিকে ঘুরে আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে, আমি সরাসরি কাউকে চিনি না। তবে আমার এক কলিগ আছে, তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে ভাল কানেকশন আছে। বললেই সে ব্যবস্থা করে দেবে।’ এবার শাহেদের দিকে ঘুরে আগ্রহ নিয়ে সে বলল, ‘শাহেদ ভাই, হেল্প লাগলে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। ব্যবস্থা করে দেবো।
রাগে শাহেদের মুখ লাল হয়ে গেল। কিছু না বলে সে চুপচাপ বসে থাকল।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে নাভিদ চেষ্টা করল পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যে। সে নায়লার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই শাহেদ ভাইকে পান এনে দিলে না? যাও পান এনে দাও। আমাকেও একটা দিও।’
‘আমি যাই।’ হঠাৎ করেই শাহেদ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘কেন দুলাভাই, পান খাবেন না? পানটা খেয়ে যান?’
শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে নাভিদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘তোমার জামাইকে খাওয়াও।’ বলেই দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
নায়লা আর নাভিদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই নাভিদ অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, শায়লা আপা কি সত্যি সত্যি লাস ভেগাস গেছে নাকি?’
‘সেটা তোমার জানার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ নায়লা নাভিদকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেবিলের খাবারগুলো নিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।

রাত প্রায় ১২টা।
শাহেদ ঘুমানোর আগে গেল ছেলে মেয়েদের খবর নিতে। অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু অর্পা এখনও টিভি দেখছে। শাহেদ জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার অর্পা? তুমি ঘুমাওনি এখনো?’
‘আই ক্যান্ট স্লিপ উইদাউট মামি।’
‘বাট ইউ নীড টু ট্রাই স্লিপিং এলোন সামটাইমস, ইউ নো।’
‘ইয়া আই নো এন্ড আই’ম ট্রায়িং।’
শাহেদ আর কিছু না বলে ফিরে আসতে যাবে ঠিক তখন অর্পা ডাকল, ‘বাবা!’
‘উম।’ শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কী মা?’
‘অর্ক ডিডন’ট ইট এনিথিং। হি ওয়াজ ভেরী হাংগ্রি… আই গেভ হিম ফুড বাট হি রিফিউজড।’
‘কেন?’
‘হি ক্যান’ট ইট উইদাউট মামি’স হ্যান্ড। মামি স্পয়লড হিম।’
‘এত বড় ছেলে এখনো মায়ের হাতে খায়? কি সর্বনাশ, আমি এসব কিছুই জানিনা?’
‘ইয়া, ইউ ডোন্ট নো আ লট অফ থিংস বাবা।’
‘হুম, তাইতো দেখছি। আমি আসলেই অনেক কিছুই জানিনা। কী থেকে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
গভীর চিন্তায় পরে যায় শাহেদ। মনে মনে ভাবল, ‘এতো ভাল যন্ত্রণা হলো। একজন মায়ের হাতে ছাড়া খেতে পারে না, আরেকজন মায়ের কাছে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এখন উপায়?’
শাহেদ চিন্তিত মনে ধীর পায়ে চলে গেল তার রুমে।
পরেরদিন সকালে শাহেদ আবার গেল নায়লাদের বাসায়। শাহেদকে চা-নাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ হলো ভিতরে চলে গেছে নায়লা—প্রাত্যহিক কিছু কাজ সারার জন্যে। শাহেদ চুপচাপ বসে আছে। রাজ্যের ভাবনা তার মাথায়।
নায়লা মাঝে মাঝে ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখল, শাহেদ তার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নায়লা তার হাতের কাজগুলো শেষ করে অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল শাহেদ ঠিক একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে আছে। চা-নাস্তা যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই পড়ে আছে টেবিলে। শাহেদ ছুঁয়েও দেখেনি।
নায়লা বসার ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, প্রায় পনের মিনিট হলো আপনি এভাবে ঝিম ধরে বসে আছেন। চা-টাও তো খাননি। সমস্যা কী?’
শাহেদ তাকাল নায়লার দিকে, ভাবলেশহীন চাহনি নিয়ে।
‘কী বলবেন বলেন।’
‘শায়লা একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। একটা না, আসলে কয়েকটা—বেশ কয়েকটা।’
‘তাই? কী লিখেছে?’
শাহেদ তার মোবাইল ফোন থেকে মেসেজ বের করে এগিয়ে দিল নায়লার দিকে। বলল, ‘পড়ে দেখো।’
নায়লা শাহেদের হাত থেকে ফোন নিয়ে মেসেজগুলি দেখল।
শাহেদ বলল, ‘পড়ো।’
‘জোরে পড়ব?’
‘পড়ো। জোরেই পড়ো, দেখো কি লিখেছে তোমার লাভিং সিস্টার!’
নায়লা পড়া শুরু করল।

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *