Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৩)

ফরিদের গাড়ি এসে থামল একটা ডানকিন ডোনাটস-এর সামনে।
সে তাকিয়ে দেখল সোমা চোখ বন্ধ করে সীটের উপর কাঁধ এলিয়ে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে। মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ফরিদ ওকে ডাকবে কিনা একবার ভাবল। তারপর চুপচাপ বসে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর সোমা চোখ মেলে তাকাল এবং সোজা হয়ে বসল। সে অবাক হয়ে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখল তারপর তাকাল ফরিদের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলে বোধ হয়।’
সোমা বলল, ‘আমরা কোথায়?’
‘একটা ডোনাট শপের সামনে। কফি খেতে এলাম—এদের কফিটা ভালো।’
‘ও।’ বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সোমা তারপর গাড়ি থেকে নেমে ফরিদের পিছে পিছে ঢুকল ডোনাট শপের ভিতরে।
ফরিদ সোমাকে একটা কোণার টেবিলে বসিয়ে রেখে কফি আনতে গেল। দু’টো কফি নিয়ে এসে সে দেখল সোমা রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।
ফরিদ সোমার দিকে গরম কফি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কফিতে চকলেট দেয়া আছে। এত বড় জার্নির পর এই চকলেট-কফিটা কাজে লাগবে—টায়ার্ডনেস কেটে যাবে।’
সোমা কিছু বলল না। চুপচাপ কফির কাপটা দু’হাতে চেপে ধরে গরম কফির উষ্ণতা নিয়ে নিজেকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করল। তারপর আস্তে করে একটা চুমুক দিল।
ফরিদ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তোমার দেশ কোথায়?’
‘ফরিদপুর।’
‘ফরিদপুর শহরে?’
‘জি।’
‘আচ্ছা। ভাইবোন ক’জন তোমরা?’
‘তিন ভাই-বোন। দুই বোন, এক ভাই।’
‘তুমি বড় সবার?’
‘আমি মেঝ। আমার ছোট ভাই…’
‘বোন বড়?’
‘জি।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। ফরিদ চাইছে মেয়েটিকে বিভিন্ন কথা বলে ভুলিয়ে রাখতে। ফরিদ লক্ষ্য করেছে, সোমা ক্ষণে ক্ষণেই কাঁদছে আর কিছুক্ষণ পরপর হাতের রুমালটা দিয়ে চোখের জল মুছছে। এই মুহূর্তে ওকে ব্যস্ত রাখাটা দরকার। সে প্রসঙ্গক্রমে বলল, ‘সোমা, তুমি শিকাগোতে এসেছ—শিকাগোতে বাংলাদেশিদের গৌরব করার মত বড় একটা ব্যাপার আছে।’
সোমা চোখ মুছে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ বলল, ‘এখানে সিয়ার্স টাওয়ার নামে ১১০ তলা উঁচু একটা বিল্ডিং আছে, যেটা একসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে বিখ্যাত ছিল। সেই সিয়ার্স টাওয়ারের আর্কিটেক্ট হচ্ছেন আমাদের একজন বাংলাদেশি। তুমি কি তার নাম শুনেছ?’
‘শুনেছি।’ সোমা শহীদের কাছে শুনেছে সিয়ার্স টাওয়ারের কথা। সোমা এলে শহীদ তাকে যেসব জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবে সিয়ার্স টাওয়ার সেই লিস্টের মধ্যে আছে। সে জানে তার নাম। সে বলল, ‘এফ আর খান।’
‘হ্যাঁ, ফজলুর রহমান খান—সংক্ষেপে এফ আর খান। আর ঐ টাওয়ার সংলগ্ন একটা রাস্তার নাম এফ আর খান ওয়ে’***
‘তাই?’
‘হ্যাঁ।’ ফরিদের মুখে গর্বের হাসি দেখা দিল। শিকাগোতে তার পরিচিত কেউ এলেই সে তাকে নিয়ে যায় সিয়ার্স টাওয়ার দেখাতে। তার খুব গর্ব হয় এই ভেবে যে এই শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ এই ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন তার দেশেরই একজন। যিনি ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর আইনস্টাইন হিসেবে বিশ্বখ্যাত। যাকে বলা হয় ‘টিউব্যুলার ডিজাইন’ এর জনক। কখনো দেখা হয়নি—তবু মনে হয়, কি এক আত্মার বাঁধনে যেন সবাই জড়িয়ে আছে ঐ মানুষটার সাথে। মানুষটা বেঁচে থাকলে ফরিদ নিশ্চিত তার সঙ্গে দেখা করে একটা স্যালুট দিত।
শিকাগো শহরের সব বাঙালীদেরই বোধহয় এমন হয়। সে যে প্রান্তেই যায় না কেন ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ যেন ছায়ার মত অনুসরণ করে—অভয় দিয়ে যায় অবিরত। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এ শহর সৃষ্টিতে তাদেরও অবদান আছে। এ মহান বাঙ্গালি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত তৈরি এবং তহবিল গঠনের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরী হয় শিকাগো ভিত্তিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি ওয়েলফেয়ার আপীল’। উল্লেখ্য, এফ আর খানের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাঁর প্রতি সম্মাননা দেখাতে গিয়ে ১৯৯৮ সালে শিকাগো সিটি কাউন্সিল সিয়ার্স টাওয়ারের সামনের রাস্তার নামকরণ করে ‘এফ আর খান ওয়ে’।
ফরিদ আবার বলল, ‘শিকাগো শহরে আমার প্রিয় জায়গাগুলোর একটি এই রাস্তাটি—আমি যখনই এই রাস্তায় গিয়ে ‘এফ আর খান’ এর নাম দেখি, তাকিয়ে থাকি কয়েক মিনিট। মনে হয় পথচারীদের কাছে গিয়ে বলি, তোমরা কি এই লোকটাকে চেনো? এর বাড়ী কোথায় জানো?’
সোমা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে। হঠাৎ করেই যেন মানুষটা বদলে গেছে। একেবারেই অন্যরকম লাগছে। প্রবাসে একজন বাঙালীর সাফল্যে আরেকজন কেমন বুক ফুলিয়ে কথা বলছে। দেশকে নিয়ে ভাবছে—অন্যরকম ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠল সোমার।
‘আরো ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার আছে।’ ফরিদ বলেই চলেছে, ‘এখানে ডেভন এভিনিউ নামে একটা জায়গা আছে—যেখানে সাউথ এশিয়ানদের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-দোকানপাট-রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেও একটা সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’—দারুণ না?’
‘অবশ্যই।’
‘তোমার তো খুশী হবার কথা। আফটার-অল তোমরা ফরিদপুরের মানুষ!’
উত্তর না দিয়ে কথার মধ্যে হঠাৎই সোমা কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমি যে এখানে কেন আসতে গেলাম। আল্লাহ কেন যে আমাকে এমন বিপদের মধ্যে ফেলল।’
ফরিদ অপ্রস্তুত হয়ে তাকাল সোমার মুখের দিকে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না হাসতে হাসতেই একটা মেয়ে কি করে এভাবে কাঁদতে পারে। সে চশমার ফাঁক দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সোমা চোখ মুছে একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘জানেন ওর সাথে না লন্ডন এয়ারপোর্ট থেকেও আমার কথা হয়েছে। আমি একজন বাঙালীর কাছ থেকে ফোন নিয়ে কথা বলেছিলাম। ও বলছিল—ও ঠিক সময়ে হাজির থাকবে। ও যে কেন আসল না…’ বলতে বলতে সোমার কান্নার জোর আরো বেড়ে গেল।
ফরিদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘দেখো সোমা, শহীদ সাহেব কেন আসল না তা নিয়ে পরেও ভাবা যাবে। আর সে যদি কোনো কারণে দেরীতেও আসে—এয়ারপোর্টে একটু খোঁজ নিলেই সে জেনে যাবে যে তুমি এসেছ। আমরা এয়ারওয়েজ অফিসে বলে এসেছি যে বাংলাদেশ থেকে সোমা ইসলাম নামে যিনি এসেছেন তিনি আমার সঙ্গে আছেন। আমি আমার ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। কাজেই শাহীদ সাহেব ফোন করলেই জেনে যাবেন যে তুমি কোথায় আছ। তাই তো?’
সোমা কান্না থামিয়ে মাথা নাড়ল।
এরপর কথা বন্ধ করে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ কফিতে চুমুক দিতে থাকল। ফরিদ বলল, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুমি ওয়েট করেছ। তুমি নিশ্চয়ই টায়ার্ড।’
সোমা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
‘এখন তোমার কাজ হচ্ছে একটু খাওয়া-দাওয়া করা এবং ফ্রেশ হওয়া।’
‘না না আমার একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি আরেকবার ওকে ফোন দিন না।’
‘ফোন তো বেশ কয়েকবার করলাম—ধরে না তো। দাড়াও দেখছি…’ বলতে বলতে ফরিদ আবার ডায়াল করল। বরাবরের মতোই রিং হলো কিন্তু ধরল না কেউ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফরিদ বলল, ‘ধরছে না। সরাসরি ভয়েজ মেইলে চলে যাচ্ছে—এনসারিং মেশিন।’
‘তাহলে চলেন, ওর বাসায় চলে যাই। ঠিকানা তো আছেই।’
ফরিদ চুপ করে রইল। সোমা সাথে সাথেই বলল, ‘ঠিক আছে আপনার যেতে হবে না। আপনি আমাকে একটা ক্যাব ডেকে দেন—আমি একাই চলে যাব।’
‘ঠিক যেতে পারবে?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘অবশ্য ভয়ের কিছু নেই—চিন্তারও কিছু নেই। সমস্যা হবার কথা না। ঠিকানা বলে দিলে ঠিক জায়গা মত পৌঁছে দেবে।’ একটু থেমে ফরিদ বলল, ‘কিন্তু যেয়ে যদি দেখো শহীদ সাহেব বাড়িতে নেই, তখন কি করবে?’
‘না না তা কেন হবে?’
‘তা হবে না কিন্তু ধরো যদি হয়ে যায়। গিয়ে দেখলে শহীদ নেই—দরজা খুলছে না। তখন কি করবে তুমি?’ থেমে থেমে কথাগুলি বলে সোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফরিদ।
‘তাহলে আপনিও চলেন না আমার সঙ্গে।’ সোমার কণ্ঠে আকুতি ফুটে উঠল। সে আবার বলল, ‘আপনার এখন কি কাজ?’
‘কাজ তো কিছু না কিছু আছেই। কাজ ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? ধরো, ফুটপাতে যে মানুষটি ঘুমায়, সেই জায়গাটা খুঁজে বের করাটা তার জন্যে কিন্তু একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ তাই না?’
সোমা মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন আপনার কি কাজ? খুব জরুরী?’
‘হ্যাঁ খুব জরুরী।’
সোমার মন খারাপ হয়ে গেল। হয়ত এখুনি কেঁদে ফেলবে আবার। তবুও সে জানতে চাইল, ‘কি কাজ?’
ফরিদ মুচকি হেসে বলল, ‘এখন আমার প্রথম কাজ হচ্ছে—সোমা নামে যে মেয়েটি এই মুহূর্তে আমার সামনে বসে আছে তাকে শহীদ সাহেবের বাসায় পৌঁছে দেয়া।’
মুহূর্তেই সোমার চেহারা বদলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মনটা ভরে উঠল। পৃথিবীতে এত ভালো মানুষ আছে ভাবতেই ভালো লাগছে।
ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘চলো তাহলে।’
সোমাকে নিয়ে ফরিদের গাড়ি এসে থামল ছোট্ট একটা একতলা বাড়ির সামনে। ফরিদ গাড়ি থেকে নেমে ঠিকানা মিলিয়ে দেখল ঠিক জায়গায়ই এসেছে। নিশ্চিত হবার জন্যে সে আরো একটু সামনে গিয়ে ভালো করে দেখে নিল। তারপর দূর থেকে বলল, ‘হ্যাঁ এটাই।’
সোমা দ্রুত নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল বাড়িটার প্রধান দরজার দিকে। ফরিদ লাগেজ নিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। তারপর কলিং বেল চাপল। একবার। দুবার। তিনবার।
কেউ দরজা খুলল না। ফরিদ বলল, ‘বাসায় তো মনে হচ্ছে কেউ নেই।’
সোমার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
ফরিদ ফোন বের করে রি-ডায়াল করল শহীদের নাম্বারে। ফোনের শব্দ ভেসে এলো ঘরের ভিতর থেকে। তারা দুজনেই তাকাল ভিতরের দিকে। ফোন বেজেই চলেছে। ফরিদ বলল, ‘ভিতরে তো রিং হচ্ছে—কেউ তো ধরছে না।’
সোমা বলল, ‘এখন কি হবে?’
ফরিদ ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সোমা বলল, ‘আপনি চলে যান। আমি এখানে বসে থাকি।’
মেয়েটির কণ্ঠ কেমন অন্যরকম শোনাল। অদ্ভুত কঠিন। ফরিদ অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘তুমি একা একা থাকবে এখানে?’
‘হ্যাঁ আমি এখানে বসে থাকব।’
‘তুমি এখানে বসে থাকবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ কোল্ড ইট ইজ। তুমি তো ঠাণ্ডায় জমে বরফ হয়ে যাবে।’ ফরিদ রীতিমত ধমকে উঠল।
তবুও সোমা সিঁড়ির উপর বসে পড়ল।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। থাকো। বসে থাকো। বসে বসে অপেক্ষা করো—দেখো তোমার পতিদেব কখন আসে তোমাকে উদ্ধার করতে।’ বলেই সে গটগট করে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। গাড়ির কাছে যেয়ে সে একবার ঘুরে তাকাল সোমার দিকে।
সোমা শক্ত হয়ে বসে আছে। মনের ভিতর অনিশ্চয়তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *