marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৩)

‘এভাবে আর কতদিন চলবে? ডু সামথিং ইয়াংম্যান! শো মি সাম ফায়ার!’ প্রতিদিন খাবার টেবিলে বাবার এই কটাক্ষ শুনতে আর ভাল লাগে না।
শাহেদের কথা বলার ভঙ্গিতে নাতাশা উচ্চস্বরে হেসে ফেলল।
শাহেদ অবাক হয়ে দেখল তারপর আবার বলল, ‘ফায়ার দেখানোর জন্য কোন চেষ্টা আমি করছিনা, তা কিন্তু না। তিন বছর ধরে করছি। কিন্তু আমি হচ্ছি ভেজা কাঠ, আগুন জ্বলে না, শুধু ধোঁয়া বের হয়। আমি কী করব বলুন?’
‘ভেজা কাঠ!’ নাতাশার ভাল লাগল শাহেদের উপমাটি। সে বলল, ‘Interesting! Nice start! Please, go on…’
‘দেশে থেকে কী করব? মাস্টার্স শেষ করে বেকার বসে আছি তিন বছর। শত শত ইন্টারভিউ দিয়েও সম্মানজনক একটা কাজ জোটে নি। আমার কোন চ্যানেলও নেই, মামাও নেই। আর ঘুষ দেবার মত সামর্থ্য এবং মানসিকতা কোনটাই আমার নেই। বিদেশে অন্তত নিজের যোগ্যতায় কাজ করতে পারব, ঘুষ দিয়ে কিংবা পেছনের দরজা দিয়ে নয়।’
‘Well said. Very impressive. I like your motivation.’ নাতাশা প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল শাহেদের দিকে।
‘Thanks.’
‘মিঃ শাহেদ এবার বলুন, পাত্র হিসাবে কেন আমি আপনাকে পছন্দ করব? এটা ঠিক, আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন! Besides being a nice talker, what else you have? Convince me.’
‘জি?’
‘আই মিন, অনেকের মধ্যে আপনাকেই কেন আমি বেছে নেব? হোয়াই?’
শাহেদ ঠিক বুঝতে পারল না কী বলবে বা বলা উচিৎ।
নাতাশা আবার বলল, ‘বাইরে দেখেছেন কতজন বসে আছে? ইতোমধ্যেই এই কয়েকদিনে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। কয়েকশোর ওপরে এখনও অ্যাপ্লিকেশন জমা আছে। হয়ত আরো আসবে। তো এতজনের মধ্যে আমি কী কারণে আপনাকেই বেঁছে নেব।’
‘কারণ আমি ভদ্র, শিক্ষিত এবং সৎ। দেখতে খুব একটা সুন্দর না হলেও আমার সুন্দর একটা মন আছে। আমি মেয়েদেরকে সম্মান করি এবং…’
‘এবং…?’
‘আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি!’
‘Wow! That’s great. I think you are definitely a potential candidate, no doubt. আপনার সময় আর নষ্ট করব না। আমিও কিছুটা টায়ার্ড। আমাদের হয়তো আবার দেখা হতে পারে। Until then, do you have any questions for me?’
‘রেজাল্ট কবে পাবো?’
‘সেটা আপনি ওদের কাছ থেকে জেনে নেবেন, ঠিক আছে? ভাল থাকবেন।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল।
নাতাশা হাত বাড়িয়ে আবার হ্যান্ডশেক করল। মৃদু হেসে বলল, ‘উইশ টু সি ইউ সুন।’
শাহেদের ভেতরে একধরণের বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। সে খুশি মনে বের হয়ে গেল। নাতাশা শাহেদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। রহস্যময়ী হাসি।

এজাজ এবং জামানের সামনে এক তরুণ বসে আছে। তার অ্যাপ্লিকেশন হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে জামান জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি বায়োডাটা ও ছবি এনেছেন?’
‘জি জি এনেছি।’ তরুণ তার ফাইল থেকে বায়োডাটা আর ছবি বের করে জামানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘ম্যাডাম আপনার প্রোফাইল রিভিউ করবেন। উনি যদি পছন্দ করেন, তাহলে আপনাকে ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হবে।’
কথা শেষ করে জামান দেখল নাতাশার রুম থেকে বের হয়ে শাহেদ দাড়িয়ে আছে। জামান দ্রুত একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘আসেন শাহেদ ভাই, বসেন। ইন্টারভিউ কেমন দিলেন?’
শাহেদ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ‘জি, বুঝতে পারছি না। এ ধরণের ইন্টারভিউ আগে কখনও দেই নি তো। আচ্ছা, রেজাল্ট কবে নাগাদ পাওয়া যাবে?’
‘দেখুন, ম্যাডাম গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। এখনো কাউকে পছন্দ করতে পারেন নাই। উনি আরো কিছু ইন্টারভিউ নিবেন তারপর ভেবে চিন্তে একটা ডিসিশন দেবেন।’
‘ও আচ্ছা!’
এজাজ বলল, ‘আপনার মোবাইল নাম্বার তো ফাইলে আছেই, ফলাফল পরে জানানো হবে।’
জামান বলল, ‘একটা কথা শাহেদ সাহেব। ম্যাডাম যাকেই পছন্দ করুক না কেনো, বিয়েটা উনি তাড়াতাড়িই সেরে ফেলবেন। এবং পাত্রকে সম্ভব হলে তার সাথেই নিয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে ভিসা প্রসেসিং, মেডিক্যাল হাবিজাবি অনেক খরচ আছে। বিষয়টা মাথায় রাখবেন।’
শাহেদ কিছু বলার আগেই এজাজ বলল, ‘আবার বইলা বসবেন না, এতো টাকা লাগবে ক্যান?’
শাহেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘কোন আইডিয়া আছে, কত লাগতে পারে? না, মানে জানা থাকলে ভাল হত আর কি।’
এজাজ বলল, ‘আগে সিলেকশন পান, পরে জানবেন।’
জামান বলল, ‘আসলে আগাম কিছুই বলতে পারছি না। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
‘আমি আজ আসি তাহলে।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক তখনই সে শুনতে পেল—
‘জামান ভাই, আজ আর আমি কারো সঙ্গে দেখা করব না। বাসায় যাব, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলুন।’
শাহেদ ঘুরে দেখল নাতাশা দরজায় দাঁড়িয়ে। উপস্থিত অন্যান্য ক্যান্ডিডেটরাও ঘুরে তাকাল নাতাশার দিকে। সবার চোখ বড় হয়ে গেল।
নাতাশা সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে এনে স্থির হল শাহেদের দিকে। মুচকি হেসে হাত নাড়ল শাহেদকে লক্ষ করে। তারপর ঢুকে গেল তার রুমে।
শাহেদ নির্বাক তাকিয়ে রইল নাতাশার রুমের দিকে তারপর হালকা পায়ে বের হয়ে গেল ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে। নাতাশার সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করেছে। বেইলি রোডের ফুটপাত দিয়ে সে হাঁটতে থাকল আনমনে।

মনোমুগ্ধকর একটি বিকেল!
আকাশের সর্বত্র আজ নীলের ছড়াছড়ি। নীল আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মত শুভ্র মেঘের বাস, অদৃশ্য মৌনতায় ছেয়ে আছে চারিদিক। শরৎ শুরু হয়েছে। শরতের আকাশে মেঘের লুকোচুরি। শরতের আলোছায়ার খেলা চলছে; এই মেঘ, এই বৃষ্টি, তো কিছুক্ষণ পরই রোদ।
ঢাকা শহরের বারিধারাস্থ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের নিরিবিলি জায়গায় সোমা আর রাজন বসে রয়েছে। ২৭ বছরের সুদর্শন যুবক রাজনের সাথে সোমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সোমা বলল, ‘মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে আজ।’
রাজন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে সোমার মুখের দিকে। যেন শরতের সব স্নিগ্ধতা মেখে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে আছে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘তাহলে তো ভালই হয়। দুজনে ভিজব।’
‘ইশ্‌, কত শখ, দুজনে ভিজব? ওসব ভেজা-ভিজি আমাকে দিয়ে হবে না। রাজন, চল ফিরে যাই। অনেকক্ষণ তো হল।’
‘কেন, ভাল লাগছে না তোমার?’
‘লাগছে, কিন্তু কি লাভ? এক সময় তো ফিরতে হবেই।’
‘ফেরার দরকারটা কি? চলনা, দুজন মিলে হারিয়ে যাই?’
সোমা গানের সুর ভাজল, ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব, হারিয়ে যাব আমি তোমার সাথে। সেই অঙ্গীকারের রাখী পরিয়ে দিতে কিছু সময় রেখ তোমার হাতে।’ দু’লাইন গেয়েই সোমা হেসে ফেলল। হাস্তে হাসতেই বলল, ‘হারিয়ে যাব, তবে আজ নয়। এখন আমাকে যেতে হবে রাজন, ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।’
সোমা ঢাকা শহরের বারিধারাস্থ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ২৭ বছরের সুদর্শন যুবক রাজনের সাথে সোমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজন দেখা করতে এলে, ক্যাম্পাসের নিরিবিলি এই জায়গাটায় তারা দুজন এসে বসে।
সোমা উঠে দাঁড়াতেই রাজন বলল, ‘আজ ক্লাসে যেতে হবে না। একটা দিন ক্লাস মিস করলে কি হয়?’
‘অনেক কিছু হয়। তোমার কি? পরীক্ষা শেষ, বিসিএস শেষ, রেজাল্ট পেয়েছ, শুধু জয়েনিং-এর অপেক্ষা। চল, উঠি।’
অগত্যা রাজন উঠে দাঁড়াল। আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আবার কবে দেখা হবে?’
‘আরে, দেখাতো প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে! চল তো, উঠ।’ বলেই সোমা আবার গানের সুর ভাঁজল, ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়ত।’
হাঁটতে হাঁটতে রাজন বলল, ‘তোমার এই ব্যাপারটা আমার দারুণ ভাল লাগে।’
‘কোন ব্যাপারটা?’ আয়ত চোখে সোমা জানতে চাইল।
‘এই যে সুযোগ পেলেই গানের সুরে কথা বল। তোমার গলা খারাপ না, গান শিখলেও পারতে।’
‘হ্যাঁ, বলেছে তোমাকে।’
সোমা গানের সুর থামিয়ে দিল। রাজন বলল, ‘আহা, থামলে কেন, গাও না। ভালই তো লাগছিল।’
সোমা আবার গানের সুর ধরল।

শাহেদ বিছানায় শুয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণেই তার নাতাশার কথা মনে পড়ছে। তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নাতাশার সৌন্দর্য, তার কথা বলা, স্মার্টনেস—সব কিছু তাকে নাতাশার প্রতি আগ্রহী করে তুলল। এমন একটা মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেলে আর কী লাগে। তার ভাগ্য ফেরাতে একমাত্র অবলম্বন হতে পারে নাতাশাই। কানাডা দেশটাও খারাপ না। স্ট্যাটাসে আমেরিকার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। আমেরিকার পরেই এখন সবচেয়ে বেশি কানাডার ডিম্যান্ড। সেখানে যেয়ে একটা ভাল কাজ যোগানো কোন ব্যাপারই হবে না। তাছাড়া কানাডার সিটিজেনশিপও সে পেয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। শাহেদ গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
শাহেদ মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে নিরবিচ্ছন্ন ভাবনায় ছেঁদ পড়ল। ফোন ধরে হ্যাল বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে জামানের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘হ্যালো, শাহেদ সাহেব, আপনার জন্য একটা ভাল খবর আছে।’
শাহেদ উঠে বসল।
জামান বলল, ‘নাতাশা ম্যাডাম আপনার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড, আরও কথা বলতে চান। একবার অফিসে আসতে পারবেন?’
শাহেদ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘অবশ্যই আসতে পারব। কখন আসতে হবে?’
‘দেরী না করাই ভাল। পারলে আজকেই চলে আসেন। বলা তো যায় না।’
শাহেদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি আজকেই আসব। কোন সমস্যা নেই।’
জামান ফোন কেটে দিল।
শাহেদ অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে তার হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোনটা উপরে ছুঁড়ে দিয়ে আবার ধরেই বলল, ‘ইয়েস!’ সে সুর করে গেয়ে উঠল, ‘ওগো বিদেশিনী!’
এজাজ তাকাল জামানের দিকে। জামানের মুখে রহস্যপূর্ণ হাসি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *