ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিলির মুখের দিকে।
‘চলো আমরা একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই।’ ফরিদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল মিলি।
ফরিদের চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হলো।
‘আমার ধারণা আমাদের সবকথা শোনার পর নিশ্চয়ই একটা ভালো পরামর্শ পাওয়া যাবে।’ আগ্রহ নিয়ে কথাগুলো বলল মিলি।
মিলিকে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। অনেকদিন থেকেই ফরিদ বিষয়টা নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু নিজ থেকে ওকে সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। যদি রিয়্যাক্ট করে বসে। আজ মিলি নিজেই বলছে সে কথা—ফরিদ বেশ অবাক হলো। সে খুশি মনে বলল, ‘ভিকিকেও সাথে নিলে কেমন হয়?’
‘ভিকি?’ ভ্রু কুঁচকে বলল মিলি, ‘ওকে কেন?’
‘দেখো না কেমন সব কিছুতেই ভয় পায় ছেলেটা? একা ঘুমাতে ভয় পায়। একা একা ইভেন বাথরুমে যেতেও ভয় পায়।’
‘অতটুকুন বাচ্চা—ও তো ভয় পাবেই। এটাই তো স্বাভাবিক। আর তোমারও কোনো সমস্যা আছে বলে আমার মনে হয় না। যা সমস্যা আমার—চিকিৎসা আমার দরকার। আমি নিজেও সেটা জানি। তুমি বরং ভালো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ নাও। আমি দেখা করতে চাই।’ অস্থিরকণ্ঠে কথাগুলো বলে মিলি চায়ে চুমুক দিল।
মিলির মুখ থেকে এ কথা শোনার পর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা হলো ফরিদের। মিলি এত সহজেই রাজি হয়ে যাবে—এটা ছিল তার কল্পনার অতীত। দেরি না করে ফরিদ ডিরেক্টরি ঘেঁটে শহরের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ বের করে ফেলল খুব সহজেই।
…
প্রফেসর ড. ডরথি জোনস, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট—মনোরোগ চিকিৎসার অন্যতম সেরা চিকিৎসক। তিনি একজন সজ্জন রোগী সেবী। এ পর্যন্ত হাজারো রোগী তার চিকিৎসায় সুস্থ জীবন যাপন করছে। একমাসের আগে ড. জোনসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ফরিদের ভাগ্য ভালো সে এক সপ্তাহের মধ্যেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেল।
সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ একটি জটিল চিকিৎসা। ড. ডরথি জোনস হলেন এক্ষেত্রে একজন পাইওনিয়ার। তিনি পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রোগী দেখেন। সুন্দর সুললিত কোমল ভাষায় সবার সঙ্গে কথা বলেন। নিবিড়ভাবে সকলের যত্ন নেন।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুসারে একদিন মিলিকে সাথে করে ড. জোনসের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলো ফরিদ। পেপারওয়ার্ক শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই মিলির ডাক পড়ল। মিলিকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের রুমে ঢুকল সে। তাদেরকে ভিতরে ঢুকতে দেখে ড. জোনস বললেন, ‘আমি পেশেন্টের সঙ্গে একা কথা বলতে চাই প্রথমে।’
ফরিদ মিলির হাতে একটু মৃদু চাপ দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বের হয়ে গেল।
মিলি দাঁড়িয়ে রইল একা একা।
ড. জোনস বললেন, ‘প্লিজ হ্যাভ এ সিট।’
কোনো জড়তা ছাড়াই মিলি বসল এবং খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলে গেল।
ড. জোনস খুব আন্তরিকভাবে বললেন, ‘কফি খাবেন?’
‘হ্যাঁ, খেতে পারি।’
কফি মেকার থেকে একটি পেপার কাপে কফি ঢেলে মিলিকে দিলেন ড. জোনস। নিজের জন্যেও এককাপ নিলেন। তারপর বললেন, ‘কফি খেতে খেতে কথা বলা যাক, কী বলেন মিস মিলি?’
মিলি মৃদু হেসে বলল, ‘অলরাইট।’ কফিতে একটা চুমুক দিয়ে মিলি কথা শুরু করল। একে একে সব ঘটনাই বলে গেল সে এবং আশ্চর্যজনকভাবে সবকথা বেশ গুছিয়েই বলল মিলি। ভিকির ঘনঘন ভয় পাওয়া, গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনা—সবকিছু খুলে বলল সে। বাথরুমে পানির শব্দ, ভিকির কণ্ঠ শুনতে পাওয়া—কোনো কিছুই বাদ গেল না।
মিলির কাছ থেকে সবকথা খুব মনোযোগ দিয়ে বেশ সময় নিয়ে শুনলেন ড. জোনস। তারপর চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ—আরেক কাপ কফি নিয়ে কফিতে চুপচাপ চুমুক দিতে থাকলেন। তার সামনে কেউ একজন বসে আছে, সে কথাও যেন তিনি ভুলে গেছেন।
ড. জোনস কিছুই বলছেন না দেখে মিলি অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। মিলির অস্থিরতা হঠাৎ তার নজরে এলো। তিনি মিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেসটা আমি দেখছি। ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড পেপারওয়ার্কগুলো রিভিউ করে আমি জানাব।’
ড. জোনসের কথা মিলিকে খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারল না। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘আপনি কি আমাদের বাসায় একবার আসবেন?’
‘তার কি কোনো দরকার আছে?’ ভ্রু কুঁচকে বললেন ড. জোনস।
‘আপনার মনে হয় নেই?’
‘না নেই।’
‘নাকি যেতে চাচ্ছেন না।’
‘দেখুন মিস মিলি আমি তো আপনাকে বিনে পয়সায় সার্ভিস দিচ্ছি না। আর আমার কন্সালটিং ফি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনার ধারণা আছে।’
‘জি আছে। প্রয়োজনে আপনার ফি আমরা অ্যাডভান্স পে করব।’ মিলির কথাগুলো বেশ কঠিন শোনাল। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে নিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন।
ড. জোনস অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মিলির দিকে এবং তারপর কী ভেবে বললেন, ‘ঠিক আছে, ফ্রন্ট ডেস্কে ঠিকানা রেখে যান। আমার এসিস্ট্যান্ট আপনাকে ফোনে কনফার্ম করবে।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’
কথা না বাড়িয়ে মিলি উঠে দাঁড়াল। সে একবারও পেছনে না ফিরে ড. জোনসের অফিস থেকে বের হয়ে এলো।
…
মিলি চলে যাওয়ার পর আরো বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন ড. জোনস। মিলি হঠাৎ করে এমন উত্তেজিত হয়ে গেল কেন? মেয়েটি সম্ভবত হ্যালুসিনেশনে ভুগছে—বারবার একই স্বপ্ন দেখছে। কারণটা খুঁজে বের করতে হবে। একই স্বপ্ন বারবার দেখার পেছনে একটা রহস্য নিশ্চয়ই আছে। কী সেই রহস্য? মিলি অনেক কিছুই বলেছে তবুও তার ধারণা সে কিছু একটা বিষয় চেপে গেছে। সে বিষয়টা কী? ড. জোনস মিলির বাসায় যেয়ে একবার দেখতে চান। তিনি তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে তক্ষুনি বলে দিলেন মিলির বাসা ভিজিটের ব্যবস্থা করার জন্য।
…
পরের উইকএন্ডেই ড. জোনস মিলিদের বাসায় এসে হাজির হলেন।
ঘুরে ঘুরে বাসার সব ঘরগুলো তিনি দেখলেন। ফরিদের রুমের লাগোয়া বাথরুম দেখলেন এবং ভিকির রুমে ঢুকে তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকালেন। প্রথমেই তিনি আবিষ্কার করলেন—ভিকির বিছানা আর দেয়ালের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা। বিছানার নিচে, দেয়াল ঘেঁসে অনেকগুলো বালিশ ফেলে রাখা হয়েছে। তার মানে ঘুমের মধ্যে ভিকি নিচে পড়ে গেলে যেন ব্যথা না পায় তাই এই ব্যবস্থা। হয়ত এর আগে ভিকি ঘুমের মধ্যে গড়িয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেছে। এটা অসম্ভব নয়—ভয় পেয়ে ভিকি যখন ফরিদকে ডেকে বলেছে নিচে কেউ আছে, ফরিদ ঝুঁকে দেখার সময়ই ভিকি দেয়ালের দিকে সেঁটে গিয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে যায়। ভিকিকে একবার বিছানার ওপরে আর পরক্ষণেই আবার মেঝেতে দেখতে পায় ফরিদ। এবং ভয় পেয়ে মুর্ছা যায়।
এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো ব্যাখ্যা তার মাথায় এলো না। যদিও তার মধ্যে খানিকটা সংশয় থেকেই গেল। সময় আসুক ভেবে দেখা যাবে।
ড. জোনস মিলিকে নিয়ে তাদের বেডরুমে এলেন। সেখানে ঢুকেই চারিদিকে এক নজর দেখলেন। তিনি লক্ষ করলেন বিছানার পাশের টেবিলে ছোট একটা বাচ্চা ছেলের ছবি ফ্রেমবন্দী করা। বয়স এক থেকে দেড় বছর হবে হয়ত। সমুদ্র সৈকতে মিলি বসে রয়েছে আর তার একটু সামনেই বালু নিয়ে খেলছে ছেলেটি। ড. জোনস ছবিটি একবার হাতে নিয়ে দেখে আবার নামিয়ে রাখলেন।
‘আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর?’ প্রশ্ন করে মিলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ড. জোনস।
‘আট বছর।’
‘একটাই ছেলে?’
উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল মিলি। ড. জোনস তার দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে।
মিলি মৃদু স্বরে বলল, ‘জি।’
‘ভেবে উত্তর দিতে হলো?’
‘আমাদের আরেকটি ছেলে ছিল।’ বলেই বেডসাইড টেবিলে রাখা ছবিটির দিকে তাকাল মিলি। ড. জোনস তা লক্ষ করলেন।
‘ছিল?’
মিলি নিশ্চুপ।
‘এখন নেই?’
‘না।’
ড. জোনস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মিলির দিকে। কিছু একটা আঁচ করতে পারলেন তিনি—সময় দিলেন মিলিকে স্বাভাবিক হবার।
‘ও মারা গেছে।’ মিলি বলল।
‘কীভাবে?’
‘বাথটাবে। গোসলের সময়।’
‘তার মানে খুব ছোট অবস্থায়। কত বয়স হয়েছিল ছেলেটার?’
‘দেড় বছর।’
‘আপনি কাছে ছিলেন না?’
‘ছিলাম।’
‘তাহলে?’
মিলি চুপ করে রইল।
‘অন্যমনস্ক ছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বাথটাবের পানি বন্ধ করতে ভুলে গেছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই।’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন ড. জোনস। ‘ঘটনা যাই ঘটুক, যেভাবেই ঘটুক—সত্যটা জানা প্রয়োজন।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘রিমেমবার, আই’ম হেয়ার টু হেল্প ইউ অ্যান্ড আই নিড টু নো দ্য ট্রুথ।’
কিছু না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল মিলি। ড. জোনসের চোখের দিকে তাকাতে তার সাহস হচ্ছে না। তার ধারণা, চোখে চোখ পড়লেই ড. জোনস সব কিছু বুঝে যাবেন।
‘আমার ধারণা বাথটাবে পানি ছেড়ে দিয়ে আপনি জরুরি কোনো কারণে বাথরুমের বাইরে চলে যান। এবং একসময় ভুলে যান ছেলেকে পানিতে বসিয়ে রেখে গেছেন।’
হঠাৎ করে ড. জোনসের এমন কথায় চমকে উঠল মিলি। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল ড. জোনসের দিকে।
ড. জোনস কিঞ্চিত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি আবার বললেন, ‘একটা পর্যায়ে যখন মনে পড়েছে, তখন দৌড়ে এসে দেখেন শিশুটি পানিতে তলিয়ে গেছে! অ্যাম আই রাইট মিস মিলি?’ অনেকটা কাঠগড়ায় উকিলদের মতো জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন ড. জোনস।
মিলি নিরুত্তর। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল উদাস দৃষ্টিতে।
‘আপনি আমার অফিসে আসুন আরেকদিন। আপনার স্বামীকেও নিয়ে আসবেন।’
ড. জোনস বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার স্বামী আর ছেলে কোথায়? ওদেরকে দেখলাম না।’
মিলি তাকাল ড. জোনসের দিকে। ‘উইকএন্ডে ফরিদ ভিকিকে নিয়ে সকার খেলতে যায়।’ উত্তর দিল মিলি।
‘ও আচ্ছা। হ্যাভ এ গুড ডে মিস মিলি—এঞ্জয় ইয়োর রেস্ট অফ দ্য উইকএন্ডস।’ ড. জোনস হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেল মিলিদের বাসা থেকে।
অন্য কেউ (পর্ব-৪)
with
no comment

