পৃথিবীর বিখ্যাত মায়ামি বিচ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যেতে পারে।
মায়ামি বিচ হচ্ছে দক্ষিণ ফ্লোরিডার একটি দ্বীপ শহর। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের সবুজাভ জলঘেরা তীরই মায়ামি বিচ। দুটো শহরকে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছে একদিকে মায়ামি নদীর ওপর তৈরি হওয়া কলিন্স ব্রিজ আর অন্য দিকে ক্যানেলের ওপরে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান ক্রিকব্রিজ। বিশাল জলাশয়ের দু’পাশে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সুন্দর শহর, যেন সাজানো গোছানো ভিডিও গেমের কোনো শহর। একের পর এক উঁচু দালান, তাদের দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও যেন কোনো ছন্দ আছে। স্বচ্ছ কাচে ঘেরা দালানগুলো, তার প্রতিচ্ছবি পানিতে পড়ে এক মুগ্ধতা তৈরি করে। আর ক্যানেল মানেই কোনো এলোপাথাড়ি কিছু নয়। দু’পাশে শান বাঁধানো ঘাট। ঝিরিঝিরি পানির নীরবে বয়ে চলার ঝলক যেন কোনো রমণীর গলার হার। মাঝে মাঝে সাদা প্রাইভেট বোট, রিভার ক্রুজগুলো সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিচের দুটো অংশ। উত্তর এবং দক্ষিণ মায়ামি বিচ। দক্ষিণ বিচটাই মূলত বিখ্যাত এবং আকর্ষণীয়। এখানে যেমন জমে ওঠে বিলাসী পর্যটকদের আনাগোনা, তেমন পৃথিবীর সব বিখ্যাত সেলিব্রেটিদের অবসর যাপন থেকে শুরু করে চলে মনোহর সিনেমা জগতের নির্মাণকাজ।
এবার মূল গল্পে ফেরা যাক।
অফিস থেকে শোভন ফোন করল বাসায়। কয়েকবার রিং বাজল। কোন সাড়া না পেয়ে সে ফোন করল নীলিমার মোবাইল ফোনে।
মুগ্ধতায় ঘেরা ফ্লোরিডার বিখ্যাত মায়ামি বিচের তীর ঘেঁষে দাঁড়ানো একটা মনোরম রেস্টুরেন্টের ব্যালকনিতে মুখোমুখি বসে আছে নীলিমা আর মাহমুদ সাজ্জাদ। দুজনেই খাবারের মেনুতে চোখ বুলাচ্ছে। এমন সময় নীলিমার ফোন বেজে উঠল। সে ফোনটা কাছে নিয়ে দেখল শোভনের নাম। উত্তর না দিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখে দিল নীলিমা।
মাহমুদ সাহেব উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘কার ফোন ছিল?’
‘শোভনের।’
‘ফোন ধরলে না যে?’
‘ধরে কি বলবো, আমি কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে সমুদ্রের পাড়ে মনোরম একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ করছি?’
‘ওকে তুমি বলে আসনি?’
‘আপনার কি ধারণা, আমি ওকে বললাম—আমি আজ কবি সাহেবের সঙ্গে তার হোটেলে দেখা করতে যাবো, আর ও সানন্দে রাজী হয়ে গেল?’
‘না তুমি বলেছিলে কিনা, ও আসতে চেয়েছিল, শেষ মুহূর্তে মাইন্ড চেঞ্জ করেছে… তাই, ভাবলাম সে হয়তো জানে। আমার অবশ্য বোঝায় ভুলও হতে পারে।’
নীলিমা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ব্যালকনিটার ঠিক নিচেই। ভর দুপুরে কি জোয়ার আসে? তাহলে ঢেউগুলো এত বড় কেন? নীলিমার নিজের মধ্যেও এমন উথাল-পাথাল ঢেউ আসে যায় সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত, সেই অশান্ত মনের ঢেউ কেউ কি কখনো দেখে? আকাশের বিশালতা আর সাগরের শত ঢেউ সবাই দেখে—শুধু মানুষের ভিতরের কষ্টের নীল ঢেউটা কেউ দেখেনা।
মাহমুদ সাহেব নীলিমার দিকে কয়েকবার তাকালেন। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকায় তার মনের অবস্থা কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অদূরে দাঁড়ানো ওয়েটারকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিলেন।
নীলিমার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাহমুদ সাহেব তাকালেন সমুদ্র সৈকতে। চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন চারিদিকটা। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। একবার পানিতে যায়, ঢেউ আসলে দৌড়ে পাড়ে চলে আসে। আবার কেউ কেউ বালি দিয়ে উঁচু করে ঢিবির মত কিছু একটা বানাচ্ছে। কেউ বানাচ্ছে ক্যাসল হাউজ। কিছুক্ষণ পর পর ঢেউ এসে সেগুলো ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলো প্রবল উৎসাহে আবার বালির ঢিবি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সার্ফাররা সার্ফিং করছে। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে খেলছে বিচ ভলিবল।
একটা লম্বা কাপড়ের বিজ্ঞাপন লেজের সঙ্গে বেধে নিয়ে আকাশে চক্কর দিচ্ছে একটা ছোট্ট প্লেন। কিছুক্ষণ পর পর সে ফিরে আসছে পর্যটক এবং সমুদ্র বিলাসী মানুষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে।
একটা যুবতী মেয়ে কাঁধে ব্যাগপ্যাক ঝুলিয়ে নিবিষ্ট মনে একটার পর একটা ছবি তুলে যাচ্ছে। একটা করে ঢেউ আসে, ঢেউয়ের সঙ্গে যা উঠে আসছে—স্টার ফিশ, জেলি ফিশ, শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক লতা-পাতা সব কিছুই ক্যামেরা বন্দি করছে সে। হয়ত কোনো রিসার্চ পেপার তৈরী করতে হবে সে জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে কে জানে।
সৈকতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যাই বোধ হয় বেশী। বেশিরভাগ মেয়েরাই শরীর উন্মুক্ত করে বালির মধ্যে শুয়ে রয়েছে। মাত্র দু’চিলতে কাপড় ছাড়া তাদের শরীরে আর কিছুই নেই। প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে রৌদ্রস্নান করছে। কেউ নানা রঙের ছাতার নিচে বসে বই পড়ছে। সমুদ্রের গর্জন, মানুষের হৈ-চৈ কোনো কিছুই তাদের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না।
এসব দেখতে দেখতে কবি মাহমুদ সাজ্জাদের একটা উপলব্ধি হলো—কি অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা এই সমুদ্রের। এর সৈকত, বালি আর পানি মানুষকে টেনে রাখে বহুক্ষণ৷
দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। রোদের তেজ নেই। সমুদ্রের বাতাসে শাড়ির আচল আর চুল উড়িয়ে নীলিমা হাঁটছে সৈকতের তীর ঘেঁষে তার প্রিয় কবির পাশে পাশে। আকাশে মেঘ করেছিল—মেঘটা কেটে গেছে। সেই সাথে কেটে গেছে তার মনের মেঘ। এই মুহূর্তে তার জীবনের একটা অন্যরকম ভালোলাগার সময় কাটাচ্ছে তার প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হাটার পর নীরবতা ভাঙল নীলিমা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে কবির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবছেন?’
‘উম, তেমন কিছু না।’
‘আজ ক’ তারিখ জানেন?’ নীলিমা বলল।
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বললেন, ‘৩ তারিখ। ৩রা জুন।’
‘৩রা জুন কবিতাটাও আমার খুব প্রিয়। একটু শোনাবেন?’
মাহমুদ সাহেব আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘ওগো সুন্দরী, মনে আছে কাল ৩রা জুন?’
সেকি ভুলে গেছো, তুমিতো দেখছি সাংঘাতিক…’
নীলিমা হেসে দিয়ে পরের দু’লাইন জুড়ে দিল।
‘তুমি যা বলছো স্বীকার করছি, ইয়েস স্যার
বিয়ে আমাদের হয়নি এবং হবেও না…’
কবি: ‘তাতে কি হয়েছে? মনে মনেই তুমি পার্বতী
৩রা জুনের বিকেল থেকেই, সেটাতো ঠিক?’
নীলিমা: ৩রা জুনেই প্রথম উঠল ঘূর্ণিঝড়…
কবি: ৩রা জুনেই প্রথম প্রবল বৃষ্টিপাত…
নীলিমা: আকাশে আতর ছুঁড়ল, প্রথম কদম ফুল…
কবি: একটি রুমালে তোমার হাত ও আমার হাত।
মাহমুদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে তুমিতো ভাল আবৃত্তি করো।’
‘বাড়িয়ে বলার কোন প্রয়োজন নেই। এটাকে ভাল আবৃত্তি বলে না।’ নীলিমা লজ্জা পেয়ে বলল।
‘তাহলে কী বলে?’
নীলিমা হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ঘুরে বলল, ‘চলুন ফেরা যাক।’
…
জামান অনেকক্ষণ থেকে হোটেল গার্ডেন ইনের লবিতে বসে অপেক্ষা করছে মাহমুদ সাহেবের জন্যে। কিন্তু তিনি কখন ফিরবেন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে নির্দিষ্ট করে কিছুই জানাতে পারল না। মাহমুদ সাহেবের কাছে কোনো মোবাইল ফোন না থাকায় কিছু জানাও সম্ভব হচ্ছে না—তিনি কোথায় গেছেন কার সাথে গেছেন। অথচ জামানের সঙ্গে সকালেই কথা হয়েছে সে সন্ধ্যায় এসে তাকে নিয়ে যাবে রাতের ডিনার করাতে। দেশ থেকে যখন কোনো শিল্পী অথবা কবি-সাহিত্যিক আসেন তারা সাধারণত স্থানীয় সংগঠকদের কিংবা অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কাউকে না জানিয়ে অন্য কারো সঙ্গে কোথাও যান না। জামান একটু চিন্তায়ই পড়ে গেল—তাহলে তিনি গেলেন কোথায়?
হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে গাড়ি পার্ক করল নীলিমা। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলে নীলিমা বলল, ‘একটু দাঁড়ান, আমিও আসছি।’ সে মনে মনে ভাবল, এতটুকু ভদ্রতা করা যেতেই পারে। অন্তত হোটেলের মেইন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসাটা সমীচীন হবে। নীলিমা হেঁটে এগিয়ে গেল মাহমুদ সাহেবের সঙ্গে হোটেল লবি পর্যন্ত। এবং সেখানে যেয়েই দেখতে পেল জামান দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ বড় করে জামান দেখল মাহমুদ সাহেবের পাশে হেঁটে আসা নীলিমাকে। তার মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা কী হতে পারে। নীলিমার সঙ্গে মাহমুদ সাহেবের সংযোগ কিভাবে হলো। কিংবা সম্পর্কটাই বা-কী? সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল।
নীলিমা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে জামানকে দেখেই তাকাল মাহমুদ সাহেবের দিকে। তিনি চোখের ইশারায় অভয় দিলেন নীলিমাকে। নীলিমা ইতস্তত করে বলল, ‘আমি বরং এখন যাই।’
‘চলো, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
‘না না তার দরকার হবে না।’
‘ঠিক আছে তাহলে, পরে কথা হবে। ড্রাইভ সেফ।’
নীলিমা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে গেল তার গাড়ির কাছে। কয়েক মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবল কিছু। তাকাল হোটেল লবির দিকে। কাউকে দেখতে পেল না। সে বিলম্ব না করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল হোটেল পার্কিং থেকে।
নীলিমা চলে যেতেই মাহমুদ সাহেব এগিয়ে গেলেন জামানের সামনে। কিছুটা অবাক হবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আরে জামান সাহেব, আপনি কতক্ষণ?’
‘এইতো মিনিট বিশেক হবে।’ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জামান বলল।
‘আজ রাতে আবার কোথায়?’
‘আতিক ভাইয়ের বাসায় বারবিকিউ ডিনার।’
‘যেতেই হবে?’
জামান কী বলবে বুঝতে পারল না। সে বোকার মত হেসে বলল, ‘সবাই অপেক্ষা করছে।’
‘সবার সঙ্গেই তো দেখা হয়েছে কয়েকবার।’ একটু চুপ করে থেকে মাহমুদ সাহেব আবার বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
মাহমুদ সাহেব হেঁটে গিয়ে এলিভেটরে উঠলেন। এলিভেটরের দরজা বন্ধ হতেই জামান তার হাতের ফোন নিয়ে ফোন করল কমিউনিটির নেতা গোছের কাউকে। অপরপ্রান্ত থেকে ভদ্রলোক ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে কবির ভাই, গরম খবর আছে।’
‘আরে জামান? খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে। বলো কী খবর?’ কবির ভাই বললেন।
‘আরে শোনেন কী হয়েছে। আমি আসছি মাহমুদ ভাইকে নিতে তার হোটেলে, ডিনারে নিয়ে যাবো বলে। যা দেখলাম, আমারতো চোখ ছানাবড়া। না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।’
‘বুঝলাম না। মানে কী?’
‘মানে তো ফোনে বুঝানো যাবে না। রাত্রে আসতেছি বাসায়। ঘুমায়েন না।’
‘মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু। আমি জেগেই থাকব, তুমি এসো কিন্তু।’
লাইন কেটে দিয়ে ফোন হাতে কিছুক্ষণ বসে রইল জামান। একধরনের অস্থিরতা এসে ভর করেছে তার ওপর। সে এবার ফোন করল মুনার স্বামী সাগরকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে সাগর? আচ্ছা, শোভন ছেলেটার ওয়াইফ নীলিমা, মুনার ফ্রেন্ড তাইনা?’
‘হ্যাঁ। কেন জামান ভাই?’ সাগর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘আছে, ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা আছে… তুমি কিন্তু মুনাকে কিছু বলতে পারবা না, প্রমিজ?’
‘আচ্ছা, ঘটনাটা কী বলেন শুনি?’
জামান ঘটনার বর্ণনা দেয়ার আগে মনে মনে গুছিয়ে নিল কী বলবে আর ঠিক তখনই দেখা গেল এলিভেটর থেকে মাহমুদ সাহেব বের হয়ে আসছেন। জামান ফিস ফিস করে বলল, ‘শোন, আমি তোমাকে পরে কল দিবো। একটু রাত হইতে পারে। ঘুমায়ো না। আরে শহর গরম করা খবর আছে।’
সাগর আর কিছু বলার আগেই জামান ফোন কেটে দিল।
মাহমুদ সাহেব কাছে আসতেই জামান বলল, ‘রেডি?’
‘হ্যাঁ রেডি। চলুন।’
তারা হোটেল থেকে বের হয়ে গেল।
…
শোভন একটু রাতে করেই বাসায় ফিরল।
নীলিমা বিছানায় শুয়ে ছিল। সে উঠে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে বিছানা থেকে নেমে কিচেনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। শোভন বলল, ‘আমি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা একটু দাঁড়াল। কিছু না বলে কিচেনে গেল সে। ডাইনিং টেবিল থেকে তার নিজের জন্যে কিছু খাবার প্লেটে নিয়ে মাইক্রোওভেনে গরম করতে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। প্রতি রাতেই নীলিমা শোভনের জন্যে অপেক্ষা করে অন্তত রাতের খাবারটা যাতে একসাথে খেতে পারে। ওর একা খেতে ভালো লাগে না। কিন্তু দেখা যায় প্রায় রাতেই শোভন বাইরে থেকে খেয়ে আসে।
প্লেট নিয়ে সে টেবিলে বসে চুপচাপ খাচ্ছিল। কাপড় বদলে শোভন এসে একটা চেয়ার টেনে বসল নীলিমার সামনে। নীলিমা ভাবল ও বোধহয় মত বদলে খেতে এসেছে। শোভনের সামনে প্লেট এগিয়ে দিতেই শোভন বলল, ‘একবার তো বলেছি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা আর কিছু বলল না। মনে হচ্ছে কোনো কারণে শোভনের মেজাজ বিগড়ে আছে। তার মেজাজ যদিও ইদানীং প্রায়ই খারাপ থাকে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও ঝামেলা করে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শোভন জিজ্ঞেস করল, ‘ফোন ধরো নি কেনো তখন?
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ খেতে থাকল। শোভন আবারো বলল, ‘বাসার ফোনও ধরলে না, সেল ফোনও ধরলে না, ছিলে কোথায় তুমি?’
নীলিমা এবারো কিছু বলল না।
‘কথা বলছো না কেন?’ শোভন ধমকের স্বরে বলল।
‘একটু বিচের ধারে গিয়েছিলাম।’
‘কেন?’
‘এমনিই। বাসায় একা ভাল লাগছিল না তাই।’
‘তাহলে ফোন ধরে সেটা আমাকে জানালেই হতো। ফোন ছিল না সাথে?’
‘ছিল।’
‘তাহলে ধরো নি কেন?’
‘ধরতে ইচ্ছে করে নি।’
‘নাকি অন্য কোন অসুবিধা ছিল।’
নীলিমা বুঝতে পারছে না শোভন কী বলতে চাইছে। সে ভিতরে ভিতরে একটু শঙ্কিত হলো। তবে কি জামান ভাই কিছু বলেছে শোভনকে? একমাত্র সেই নীলিমাকে দেখেছিল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে হোটেলের লবিতে। তাই যদি হয় তবে শোভন ওর রাতের ঘুম হারাম করে দেবে। নীলিমা মনে মনে তৈরী হয়ে নিল।
‘কথা বলছ না কেন? বলো?’ শোভন এবার বেশ কঠিন স্বরেই জানতে চাইল।
নীলিমা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আজকে হার্ডবল প্লে করতে হবে। সে খাওয়া বন্ধ করে হঠাৎ করেই উত্তর দিল, ‘সব কথা তোমাকে বলতে হবে? তুমি বলো? তুমি কি করো, কখন কোথায় যাও, অফিস থেকে ফিরতে কেন দেরী হয়, আমাকে বলো? তাহলে আমার সব কথা তোমাকে বলতে হবে কেন?’
শোভন থতমত খেয়ে গেল। নীলিমার এমন আক্রমণাত্মক উত্তরের জন্যে সে একবারেই প্রস্তুত ছিল না। সম্পূর্ণ অচেনা কণ্ঠ। শোভন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নীলিমার দিকে, তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সেই অগ্নি চক্ষুকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে নীলিমা তার খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেল অন্য রুমে।
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৪)
with
no comment

