Tritio-Pokkho

তৃতীয় পক্ষের কথা

এ পৃথিবীতে বিভিন্ন মানুষের মাথায় বিভিন্ন ধরনের পাগলামি ভর করে। তেমনি কিছু মানুষের মাথায় এই ধরনের পাগলামিও ভর করে যে তারা বই ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না! সময় সুযোগ পেলেই মজে থাকে গল্পতে। এই তৃতীয় পক্ষ বইটিও তেমনি একটা বই যে বইয়ের গল্পগুলো নেশার মত শুধু টানতে থাকে বইয়ের ভেতর মুখ গুজে বসে থাকার জন্য।
প্রথমেই আমি যখন বই পড়তে শুরু করি যে কোন বইই হোক না কেন সবার আগে বইয়ের ভেতর নাক মুখ গুজে বইয়ের মাতাল করা ঘ্রাণ শুকে নিজের ভেতর অনুভব করার চেষ্টা করি। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুলাই উৎসর্গ পত্রের উপর। কেউ যে উৎসর্গ পত্রের দু’ তিন লাইনের লেখা দিয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের প্রতি তার সর্বোচ্চ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এভাবে করতে পারে তা ফরহাদ ভাই এর এই লেখা না দেখলে এর গভীরতা বুঝতামই না!!
এই বইয়ে মোট গল্প আছে ৫ টি। এখন আসি গল্পে। এই এত সুন্দর গল্পগুলোর বিশ্লেষণ এই কয়েক লাইনে করা অসম্ভব, তবুও কিছু চেষ্টা করি।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে: এই গল্পটি আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প গুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশের ফরিদপুরের মেয়ে সোমার বিয়ে হয় তার বোনের দেবর আমেরিকা প্রবাসী শহিদ এর সাথে। বিয়েটি হয় ফোনে,বিয়ের দুই বছর পর সোমা যখন ভিসা পেয়ে আমেরিকায় আসে এয়ারপোর্টে নেমেই শুরু হয় তার বিপত্তি। শহিদের এয়ারপোর্টে এসে সোমাকে নিয়ে যাবার কথা থাকলেও শহিদ আসেনি তাকে নিতে। অপরিচিত দেশ, অপরিচিত মানুষ, সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েও সাহায্য না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। হঠাৎই দেখা হল দেশি ভাই ফরিদ সাহেবের সঙ্গে। তারপর যেন আস্তে আস্তে সে ভরসা ফিরে পেতে শুরু করল। ফরিদ সাহেব তাকে নিয়ে শহিদের বাসায় গিয়েও তাকে না পেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে সোমাকে সামলানোর চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। এখানে ফরিদ সাহেব সোমাকে ব্যস্ত রাখতে শিকাগো শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর পাশাপাশি “এফ আর খান ” এর সিয়ার্স টাওয়ার, শেখ মুজিব ওয়ে সব কিছুর গল্প করলেন। আর লেখক সাহেব আমাদের ঘুড়িয়ে আনলেন শিকাগো থেকে কল্পনাতে। ফরিদ সাহেব শহিদকে খুঁজে বের করতে তোলপাড় করে ফেললেন সারা শহর। একটু পর পর সোমার কান্না থামানোর চেষ্টায় এটা সেটা বলে হাসানোর চেষ্টা করতেন। তার বাসায় নিয়ে তাকে সহজ করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে তাদের কিছু স্মৃতি গড়ে উঠে যেটা সারাজীবনের সুখ স্মৃতি হিসেবে থাকে। সারাটা গল্প জুড়ে শহিদকে নিয়ে উত্তেজনা কাজ করে সে কোথায় গেল এটা নিয়ে। অবশেষে ফিরে পাওয়া গেল তাকে, সে সোমাকে নিতে আসে। তার না আসার কারণ দুর্ঘটনার শিকার সব কিছুই ব্যাখ্যা করে। বিদায় বেলা করুণ সুরে আচ্ছন্ন করে পরিবেশ
হৃদয়ে আগন্তুক: হাসান আর তিথির সুন্দর সংসার তাদের ছোট্ট মেয়ে তিতলিকে নিয়ে। আমেরিকার ব্যস্ত জীবনে দুজনের ব্যস্ত সময়ই কাটছিল। হঠাৎই পরিবর্তন ঘটল তিথির বান্ধবী রুপা যখন আমেরিকায় ট্রেনিংয়ে এসে তাদের বাসায় বেড়াতে আসল। পরিবেশটা ও পাল্টে গেল, ব্যাকইয়ার্ডে বিকালে চায়ের আড্ডায় আর গল্পে জমে উঠত। ছেলে মেয়ের বন্ধুত্বের বিষয় নিয়েও বাক বিতণ্ডা চলত। অবশ্য পরের দিন থেকেই আস্তে আস্তে সব কিছু পাল্টে যেতে শুরু করল, হাসান তার কাপুরুষতার পরিচয় দিল, রুপার জীবনের বেদনাময় ঘটনা বের হয়ে এলো। হঠাৎই দেখা হল আকাশের সাথে। যে আকাশ একদিন অভিমান নিয়ে চলে এসেছিল আমেরিকায়। তিথি রুপাকে ভুল বুঝল আবার সে ভুল বুঝতে পেরে সব কিছু ঠিক করার চেষ্টাও করল। কিন্তু সবকিছু কি এত সহজে ঠিক হয়!! শেষে আকাশের সাথে রুপা চলে গেল, আকাশ প্রস্তুতি নিচ্ছে তার এক বুক ভালবাসার কথা জানাবার জন্য রুপাকে। এ দিকে তিথিও হাসানকে ক্ষমা করবে কি করবে না এই দ্বিধা দ্বন্দ্বে শেষ হল গল্পটি।
অপেক্ষা: চারদিকে অন্ধকার নেমে দমকা বাতাসে যখন ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হবে তখনই এই গল্পটির শুরু হয়। শরীফুল আলম আমেরিকার একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। ২০ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন। জীবনের ৪৭টি বসন্ত কাটিয়ে তিনি ২৪ বছর বয়সী রুবিনাকে বিয়ে করে আনলেন। যদিও তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সংসার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রুবিনা তা চায়নি! সে শুধু নিজের স্বার্থে আর গ্রিন কার্ডের আশায় বিয়ে করে। শরীফুল খুব চাপা স্বভাবের বলেই তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য এতে রুবিনার ও কোন দোষ নেই, বিয়ের আগেই বলেছিল সে অন্য কাউকে চায় কিন্তু শরীফুল পাত্তা দেয় নি ভেবেছে বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এক সময় রুবিনা শরিফকে টেনশনে রেখে ঠিকই চলে যায় সোহেলের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সোহেলের কাছ থেকেও সে ধোকা পেল। সে কি এখন ফিরবে শরীফ এর কাছে?
কী ঘটেছিল লাস ভেগাসে: শাহেদ আর শায়লার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার। শাহেদ খুবই সহজ সরল মনের মানুষ। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করে আর সাহায্য করতে চায় এবং করেও। তেমনি মাশুক যখন সবকিছু হারিয়ে রাস্তায় নেমেছিল তখন মাশুককে সাহায্যে করে নিজের বিপদ ডেকে এনেছিল, মাশুককে ওয়ার্ক পার্টনার করেছিল। আর মাশুক ব্যবসায় লস দেখিয়ে দেখিয়ে শাহেদকে ঠকিয়ে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত। তাই তাকে শিক্ষা দিতে শাহেদের স্ত্রী শায়লা বুদ্ধি করে মাশুককে নিয়ে যায় লাস ভেগাসে। আর সেখানে নিয়ে গিয়ে সব তথ্য ফাঁস করে মাশুককে এমন শিক্ষা দেয় শায়লা রুপা আর রুপার বরকে সাথে নিয়ে যে মাশুক পালিয়ে বাঁচে। শাহেদ কাজ ছাড়া কিছু বুঝত না আর টাইম দিত না বলে নায়লার সাহায্যে শাহেদকে ও টাইট দিয়ে দেয়।
একজন আজমল হোসেন: সোমা আর রঞ্জু দম্পতির ঝগড়া দিয়েই গল্পের শুরু।খুনসুটি, ঝগড়া ও ভালবাসার এক মিশ্র অনুভূতি পাওয়া যায় এই গল্পে!! সোমার সাথে ঝগড়া করে রঞ্জু যখন বেরিয়ে যায় তখনই সে একটা গাড়ির সামনে পড়লে সেই গাড়ির আফ্রো আমেরিকান চালক রঞ্জুর দিকে নোংরা ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেল। ঘটনার শুরু এখান থেকেই। আজমল হোসেন আমেরিকায় আসেন একটা রিসার্চ অ্যাসিস্টন্টশিপ নিয়ে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়ে তিনি আর এখান থেকে ফেরত যেতে চান নি। সোনার হরিণ ধরে তবেই ফিরবেন। কিন্তু সবার সব ক্ষেত্রে কি ভাগ্য সহায় হয়! তার ক্ষেত্রেও হল না। ফায়জুল তার গ্রামের ছেলে হয়েও তাকে অনেক বড় বিপদে ফেলে দিল। ফায়জুলের পরামর্শেই তিনি একটি কালো মেয়ের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করে ফেললেন। আর সেটাই তার সব থেকে বড় ভুল! এই মেয়েটি তার যা কিছু ছিল সবকিছু হাতিয়ে নিল ভয় দেখিয়ে,আর তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে অনেক অনেক অত্যাচার করল আজমল সাহেবের উপর। তিনি কোনমতে জান নিয়ে পালিয়ে এসে পরলেন সোমা আর রঞ্জুর হাতে। সোমার সেবা শুশ্রূষায় সেরে উঠতে লাগলেন আজমল সাহেব। কোন কিছু জিজ্ঞেস করলে রেগে উঠেছেন আজমল সাহেব মাঝে মাঝে, তখন সোমা রাগ দেখিয়েও পরক্ষণেই ভুলে গিয়ে আজমল সাহেবের দেখাশোনায় লেগে গেছে। সোমার এই মাতৃভাব পুরো গল্পটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রিয় মানুষটিকে মনে পরে কি না সোমার এই ধরনের প্রশ্নে আজমল সাহেবের ছলছল চোখ, রঞ্জুর সাহায্য দেশে ফেরা সবকিছু মিলিয়ে কেমন অন্য রকম একটা ভাল লাগা তৈরি করে গল্পের ভেতর।
তাই গল্পগুলো বিস্তৃত ভাবে পড়তে তাড়াতাড়ি বইটি পড়তে শুরু করুন, এবং আমি হলফ করে বলতে পারি প্রত্যেকটি গল্প অসাধারণ লাগবে।
এই প্রথম হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া অন্য কারো বই আমি গভীর ভাবে গভীর মনোযোগের সহীত পড়েছি।
সবশেষে বলতে চাই এভাবে আরও গল্প উপহার দিয়ে আমাদের মনকে আনন্দে আপ্লুত করুন এই শুভ কামনা। আর কষ্ট করে আমাকে অটোগ্রাফ সহ বইটা পাঠানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই সাহেব। যদিও বইমেলায় আমি যেতে পারিনি কিন্তু যখন বইটি আমি হাতে পাই এই বইয়ের প্যাকেট আমাকে কিছুটা হলেও বইমেলার স্বাদ দিয়েছে!! দোয়া করি আমাদের সবার হৃদয়ে এভাবে সদা হাস্যোজ্জল হয়ে থাকেন সব সময় আর আরও নতুন নতুন বই নিয়ে আসুন খুব শীঘ্রই।

লিখেছেন: ফাইজা চৌধুরী নিশি

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *