mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-১)

‘বাবা, তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসবে। এয়ারপোর্টে যেতে হবে ভুলে যেওনা আবার।’
শারমিন কফির কাপে কফি ঢেলে রহমান সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
রহমান সাহেব এক স্লাইস ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে মুখে দিয়েছিলেন, মুখের খাবার শেষ করে তিনি বললেন, ‘নারে ভুলে যাবো না। সফিকের অ‍্যারাইভাল ক’টায়?’
‘সন্ধ্যায়। সাড়ে ছ’টা।’
‘তোরা রেডি হয়ে থাকিস। আমি চলে আসব। জেসমিন যাচ্ছে তো?’
‘জানি না।’
‘ওহ।’ একটু ভেবে রহমান সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, জেসনকে বলেছিস? ও সাথে গেলে হেল্প করতে পারত।’
‘বলেছি। জেসন কাজ থেকে সরাসরি চলে আসবে এখানে।’
‘দ্যাটস গুড।’ বলেই রহমান সাহেব কফিতে চুমুক দিলেন।
শারমিন তাকাল তার বাবার দিকে। একটু ইতস্তত হয়ে বলল, ‘উম বাবা, আম্মুর কথা আমি কিন্তু সফিককে কিছু বলিনি। ভাবছি কাজটা ঠিক হলো কিনা?’
‘বলিসনি কেন? আমিতো ভেবেছি ও সবকিছু জানে।’
শারমিন নিরুত্তর রইল।
‘আর বললেই বা কী হতো? যে যাবার সে চলে যায়। এ নিয়ে তুই কিছু ভাবিস না। ও এসেই সব জানুক।’
রহমান সাহেব লক্ষ করলেন, বাসার কাপড় পরে রয়েছে শারমিন। সাধারণত সকালে নাস্তার টেবিলে ওরা বাবা মেয়ে দুজনে একসাথেই নাস্তা করে তারপর যে যার মতো কাজে চলে যায়। শারমিন অফিসে যাবার প্রফেশনাল ড্রেস পরেই নাস্তা রেডি করে দুজনের জন্য। রহমান সাহেব উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তুই কাজে যাচ্ছিস না আজ?’
‘না বাবা, ডে-অফ নিয়েছি। কিছু আইটেম রান্না করতে হবে। এই উইকেন্ডে তো রান্না করার সময় পাইনি।’
রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হাসছ কেন বাবা?’
‘না এমনিই। অনেকদিন ভালো-মন্দ কিছু খাওয়া হয় না। ভালোই হলো, সফিকের উপলক্ষে একটু ভালো-মন্দ খাওয়া যাবে। তুই কিন্তু রান্নাটা ভালোই শিখেছিস।’
‘ভালো না ছাই—মায়ের মতো তো আর রাঁধতে পারি না।’
‘যতটুকু শিখেছিস—এটুকুই বা কজন পারে?’ রহমান সাহেব তার কফিতে পর পর কয়েকটা চুমুক দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
রহমান সাহেব ডালাসে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে শারমিন, বয়স তেইশ। ছোট মেয়ে জেসমিন, বয়স উনিশ। দুই মেয়েকে নিয়েই তার বসবাস। বিভিন্ন কারণেই তার স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না দীর্ঘদিন থেকে। দিনে দিনে দূরত্ব বেড়েই চলছিল—একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, সম্পর্কে তৈরি হয় দূরত্ব। কোনো এক দিনে কাউকে কিছু না জানিয়েই রহমান সাহেবের স্ত্রী পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে আলাদা হয়ে গেছে। রহমান সাহেব অনেকটাই নির্জীব স্বভাবের একজন মানুষ। সামান্য ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটিও তিনি এড়িয়ে চলেন। কখনো কোনো কারণেই তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো রকমের তর্ক বিতর্কে যেতে চাইতেন না। তারপরেও যখন পরিস্থিতি এমন হতো যে তর্ক এড়ানো যাচ্ছে না, তিনি স্বেচ্ছায় পরাজয় মেনে নিয়ে তার পড়ার রুমে চলে যেতেন। তারপরেও তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তিনি কিছুতেই মেলাতে পারেন না। জীবনের কিছু হিসেব বুঝি কখনোই মেলে না।
একটু বেলা বাড়তেই শারমিন ব্যস্ত হয়ে পড়ল রান্নার কাজে। গায়ে একটা অ্যাপ্রন জড়িয়ে সে খুব যত্ন নিয়ে রান্না করছে। এমন সময়ে উপর থেকে নেমে এলো তার ছোট বোন জেসমিন। হঠাৎ শারমিনকে রান্না ঘরে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘Hi Sis, you didn’t go to work today—what’s going on? Are you ok?’
জেসমিনের জন্ম আমেরিকাতেই। সে অল্প বিস্তর বাংলা কথা বলতে পারে তবে উচ্চারণগত সমস্যা থাকার কারণে বেশির ভাগ সময়ে সে ইংরেজিতেই কথা বলে। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের জন্যে এটা একটা চ্যালেঞ্জই বলা চলে। কিছু কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের চাপ দিয়ে কিংবা বুঝিয়ে বাংলাটা শেখাতে পারলেও বেশির ভাগ মা-বাবাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রণে ভঙ্গ দেয়। মা-বাবাকে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, বাংলায় কথা বলতে পারে কিংবা বাংলা সংস্কৃতির প্রতি যাদের একটু ঝোঁক আছে, সেসব হাতে গোনা দু’একটা বাচ্চা ছাড়া বেশির ভাগের কাছেই মা-বাবার এত সব তৎপরতা খুবই বিরক্তিকর ঠেকে। ভেতরে-ভেতরে তারা আমেরিকান সংস্কৃতিতেই সাবলীল বোধ করে।
শারমিন কাজের মধ্যেই উত্তর দিল, ‘Yes, I’m fine.’
জেসমিন চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল বেশ কিছু আইটেম রান্না হয়েছে। আরো হচ্ছে। সে কিছুটা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘What are you cooking?’
‘এই তো ইলিশ মাছ ফ্রাই, বিফ কারি, কর্নিস চিকেন, স্পিনাচ আর ডাল। এই তুই যাচ্ছিস তো এয়ারপোর্টে?’
‘এয়ারপোর্টে কেন? Who’s coming?’
‘হু ইজ কামিং মানে? তোর দুলাভাই আসছে বাংলাদেশ থেকে। এর মধ্যেই ভুলে গেলি?’
‘Is he coming today? OMG! I totally forgot.’
‘ফরগেট তো হবেই। ফ্রেন্ডস আর পার্টি ছাড়া ফ্যামিলির অন্য কোনো কিছুতেই তো তোর ইন্টারেস্ট নেই।’
‘I’m sorry but I can’t go. I’ll be going out with Alex. Say hi to BIL.’
‘BIL?’
‘Brother-In-Law, stupid!’
জেসমিন আর কিছু না বলে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে গেল। শারমিন মাথা নেড়ে একবার তাকাল তার বোনের চলে যাওয়ার দিকে।

এয়ারপোর্ট থেকে সফিককে নিয়ে শারমিনদের ছোট দলটি যখন বাসায় ফিরে এলো তখনো সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েনি। ডে লাইট সেভিংস এর কারণে গরমের সময় দিনের আলো থাকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।
শারমিন, সফিক, রহমান সাহেব আর জেসন গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো একসাথে। জেসন গাড়ি থেকে নেমেই পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে সফিকের লাগেজগুলো বের করে আনল। জেসন শারমিনদের প্রতিবেশীর এক বাংলাদেশি পরিবারের ছেলে—শারমিনদের পরিবারের যে কোনো সমস্যায় কিংবা প্রয়োজনে ডাকলেই চলে আসে। জেসনের বয়স একুশ বছর। খানিকটা আপন ভোলা স্বভাবের ছেলেটি অনেকটা শারমিনদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হয়ে গেছে বলা চলে।
ঢাকা থেকে ডালাস—লম্বা জার্নি করে সফিক বেশ ক্লান্ত। কিন্তু শারমিনকে বেশ চঞ্চল দেখা গেল। দীর্ঘ দু’বছরের অপেক্ষা শেষে সফিককে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে নিয়ে আসতে পেরেছে—এটাই তার আনন্দের উৎস। তার সবাই মিলে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল জেসমিন আর অ্যালেক্স হাত ধরাধরি করে ওদের বাসা থেকে বের হয়ে আসছে। জেসমিনের পরনে পার্টি ড্রেস—কিছুটা খোলামেলা। সফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল ওদের দুজনকে। শারমিন কিছুটা অস্বস্তিবোধ করল। রহমান সাহেব রাগান্বিত দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে একবার জেসমিনের দিকে আর একবার অ্যালেক্সের দিকে তাকাল। তারপর তাকাল শারমিনের দিকে।
জেসমিন মুখে একটা স্মিত হাসি নিয়ে এগিয়ে গেল সফিকের দিকে। অ্যালেক্সও এগিয়ে গেল তার সাথে। জেসমিন দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘Hi BIL, কেমন আছো? Welcome to America!’
সফিক ঠিক বুঝতে পারল না কিছু। বিলটা আবার কি জিনিস? সে অপ্রস্তুতভাবে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিন কিছু বলার আগেই জেসমিন অয়ালেক্সকে লক্ষ করে বলল, ‘Alex, meet my brother-in-law. He just came from Bangladesh.’
অ্যালেক্স হাত সফিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘Nice to meet you, BIL Welcome to Dallas!’
সফিক আবারো বোকার মতো তাকাল। ওকে কেন বিল বলছে কোনোভাবেই তা বোধগম্য হচ্ছে না। এবার সে নিরুপায় হয়ে বলল, ‘Bil? Who’s Bil? I’m not Bil. My name is Safiq. Safiq Ahmed.’
সফিকের অবস্থা দেখে জেসমিন হেসে ফেলল। সে হাসতেই হাসতেই অ্যালেক্সের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। অ্যালেক্সও তার পিছে পিছে যেয়ে চড়ে বসল তার গাড়িতে।
জেসমিন আর অ্যালেক্স চলে যাওয়ার পরেও সফিক ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শারমিন সফিকের হাত ধরে বলল, ‘চলো, ভেতরে চলো।’
সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইল, ‘ঐ সাদা ছেলেটা কে?’
‘জেসমিনের বন্ধু।’ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শারমিন বলল, ‘লেটস গো ইনসাইড। কামঅন জেসন।’ বলেই শারমিন সফিকের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
জেসন এই পুরো সময়টাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা যখন কথা বলছিল, তখন সে লাগেজগুলো ঘরের মধ্যে রেখে এসে কথা শুনছিল ওদের। শারমিন আর সফিক ঘরের ভেতরে ঢুকে যেতেই সে তার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দ্রুত চলে গেল বাসার সামনে থেকে।

পরের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *