বিজ্ঞাপন দাতাদের একজনের নাম এজাজ খান। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। বেইলি রোডের ফুটপাত দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল সে—গন্তব্য ‘EZ Marrage Media’ অফিস।
এজাজ এবং জামান, দুই বন্ধুর আদ্যক্ষর নিয়ে তাদের এজেন্সির নাম। অফিসে যেতে এখনো বেশ খানিকটা রাস্তা হাঁটতে হবে। এমন সময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো?’
‘হ্যালো স্লামালিকুম। এটা কি 880171*?’ শাহেদ খুব উত্তেজিত হয়ে ফোন নাম্বারটা বলল।
‘জি, জি, নাম্বার ঠিকই আছে—বলেন।’
‘জি ভাই, আমি পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করলাম। বিষয়টা একটু জানতে চাই। একটু বিস্তারিত বলবেন?’
এজাজ বলল, ‘মোবাইলে তো ভাই বিস্তারিত বলা যাবে না। যদি ইন্টারেস্টেড হন তাইলে একটা নাম্বার দিতেছি, ঐ নাম্বার কল করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেন। কাগজ কলম আছে?’
‘জি আছে।’
‘তাইলে লেখেন। আমার পার্টনার, নাম জামান। আর নাম্বার হইতেছে…’ এজাজ নাম্বারগুলো বলল।
শাহেদ নাম আর ফোন নাম্বার লিখে, এজাজ সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন কেটে দিল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শাহেদ জামান সাহেবের নাম্বারে ফোন করল। এজাজের পার্টনার জামানও একই বয়সের। মধ্য চল্লিশ। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগেই আছে। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতে বলতে মুখ হাসি হাসি করে রাখার অভ্যাস হয়ে গেছে। জামান সাহেব অফিসের ডেস্কে বসে কথা বলছিলেন আরেকজন ক্যান্ডিডেটের সঙ্গে। তিনি ফোন ধরে বললেন, ‘হ্যালো? ইজি ম্যারেজ মিডিয়া, কে বলছেন?’
শাহেদ বলল, ‘আমি একটু জামান সাহেবের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’
‘জি বলেন, আমিই জামান।’
শাহেদ আবারো উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমার নাম শাহেদ। আপনার বন্ধু এজাজ সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। পত্রিকায় আপনাদের একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম, আমি ঐ ব্যাপারে একটু জানতে চাচ্ছিলাম। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে চাই।’
‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো ভাই করতে চান, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে কোন স্পট খালি নাই। আচ্ছা দেখি—একটু হোলড করেন।’
জামান অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যালেন্ডার পরখ করে বলল, ‘শোনেন শাহেদ সাহেব, এ সপ্তাহে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া যাবে না, আগামী ২১ তারিখের আগে কোন ডেট ওপেন নাই। ২১ তারিখ বিকাল ৪ টায় একটা স্পট আছে, যদি আসতে চান তো বলেন।’
‘জি জি অবশ্যই আসতে চাই।’ কিছু না ভেবে তাৎক্ষণাৎ অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে রাজী হয়ে গেল শাহেদ।
জামান আবার বলল, ‘ম্যাডাম কানাডার সিটিজেন। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। উনি নিজেই আপনার ইন্টারভিউ নেবেন, একটু তৈরী হয়ে আসবেন।’
জামান বিস্তারিত বুঝিয়ে বলল। শাহেদ পুরো প্রক্রিয়াটা বুঝে নিয়ে নিয়ে খুশি মনে ফোন কেটে দিল। মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করল, ২১ তারিখ বিকেল ৪ টা!
ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে এসে শাহেদ পাঁচ হাজার টাকার একটা অফেরতযোগ্য ফরম নিয়েছে। সে লাইন বাই লাইন বুঝে নিয়ে ফরমটা পূরণ করে জামান সাহেবের কাছে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
অপেক্ষারত শাহেদ অফিসের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল। তার পাশেই বসে রয়েছে বেশ কিছু ক্যান্ডিডেট। সবার বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যেই হবে। সবার চেহার মধ্যেই এক ধরণের উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হল। সবাই নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথা বলছে। কয়েকজন একেবারেই চুপ। এর মধ্যে দুজন ক্যান্ডিডেটের কথাবার্তা কানে ভেসে এল শাহেদের।
প্রথমজন তার পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ফেঞ্চ শিখেছেন?’
দ্বিতীয়জন অবাক হবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ফ্রেঞ্চ শিখব কেন? আমি তো আর ফ্রান্সে যাচ্ছি না যে আমাকে ফ্রেঞ্চ শিখতে হবে।’
প্রথমজন একটু ভাবের সাথে বলল, ‘ও আচ্ছা, আপনি বোধহয় জানেন না যে, ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ দুটোই কানাডার অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ।’
‘আরে ভাই, ইংরেজিটাই ভাল মত শেখা হয় নাই এখনো, আবার ফ্রেঞ্চ!’
শাহেদের ডাক পড়ল। জামান সাহেব শাহেদের অ্যাপ্লিকেশন ফরমটা একনজর দেখে এজাজের দিকে বাড়িয়ে দিল রিভিউ করার জন্য। তারপর উৎসুক দৃষ্টিতে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বিদেশ যেতে চান কেনো?’
শাহেদ কিঞ্চিৎ ভেবে বলল, ‘বিদেশ যেতে চাই কেনো? সেটা না হয় আপনাদের ম্যাডামকেই বলি।’
জামান তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, ম্যাডামকেই বলেন। উনি পাশের রুমেই আছেন।’
এজাজ ফরম দেখা শেষ করে বলল, ‘আপনার জন্যে অপেক্ষা করতেছেন। যান।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। ম্যাডামের রুম লক্ষ করে চলে যেতে উদ্যতে হতেই এজাজ বলল, ‘ভাইজান, ফিসের টাকাটা…’
শাহেদ লজ্জিত ভঙ্গিত বলল, ‘ও হ্যাঁ। এই নিন পুরো পাঁচ হাজার। গুনে নিন।’
‘না না গুনতে হবে না। জেন্টেলম্যান ডিলিং, আবার গুণাগুণই কিসের। গুনতে হবে না। যান ভিতরে যান। ম্যাডাম ওয়েট করতেছেন।’
শাহেদ ঘুরে দাঁড়াতেই এজাজ টাকা গুনা শুরু করল।
শাহেদ এগিয়ে গেল ম্যাডামের রুমের দিকে। কতগুলো চোখ তাকিয়ে আছে শাহেদের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার চুলে একবার হাত চালাল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে টোকা দিল দরজায়। ঠক, ঠক।
‘প্লিজ কাম ইন।’ ভেতর থেকে রিনরিনে কণ্ঠে কেউ বলল।
শাহেদ আস্তে করে দরজাটা খুলে প্রবেশ করল ভেতরে। ছোট একটি রুম। আসবাব পত্র বলতে একটা টেবিল, সামনে দুটি চেয়ার আর পাশে একটি সোফা। টেবিলে কিছু বিদেশী ম্যাগাজিন আর পানির বোতল দেখা যাচ্ছে। শাহেদ তাকাল।
জানালার পাশে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে ম্যাডাম। বয়স তিরিশ। লম্বায় ৫ ফুট ৪ কি ৫ ইঞ্চি হবে। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের তুলনায় লম্বাই বলা চলে। পড়নে কর্পোরেট এক্সিকিউটিভদের মত স্কার্ট, টপস ওপরে একটা কাল ব্লেজার। লম্বা চুল ছড়িয়ে পড়েছে কাঁধের উপর দিয়ে। চুলের রঙে কালোর সাথে বাদামি স্ট্রাইপ—হাইলাইটস করা সম্ভবত একেই বলে।
ম্যাডাম ঘুরে তাকিয়ে দেখল শাহেদকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে মিষ্টি করে হাসল।
শাহদের মুখ হাঁ গেল। কোনো মেয়ে এত সুন্দর হতে পারে তা তার ধারণার বাইরে ছিল। সে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল।
ম্যাডাম এগিয়ে এসে শাহেদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘হাই, আই’ম নাতাশা! নাইস টু মিট ইউ। ইউ মাস্ট বি…’
শাহেদ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘শাহেদ। শাহেদ আহমেদ। নাইস টু মিট ইউ টু।’ সে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। কিন্তু হাত ছেঁড়ে দিতে ভুলে গেল।
নাতাশা শাহেদের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। শাহেদ লজ্জা পেয়ে হাত ছেঁড়ে দিল।
‘প্লিজ হ্যাভ অ্যা সিট। মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল।’ বলতে বলতে নাতাশা সোফার এক কোনায় বসে পড়ে তাকাল শাহেদের দিকে। ইশারায় বসতে বলল।
শাহেদ ইতস্তত করে সোফার অন্য কোনায় বসে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’।
‘তারপর মিঃ শাহেদ কেমন আছেন, ভাল?’
‘জি? জি ভাল।’
‘আমি আপনার বেশি সময় নেবো না। ইট উড জাস্ট বি অ্যা ফরমাল ইন্ট্রোডাকশন। প্রথমে আমার সম্পর্কে আমি বলব; আমার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সব কথা শুনে যদি আপনার ভাল লাগে, তাহলে আপনার কথা শুনব আমি। তারপর কারো যদি কোন প্রশ্ন থাকে সেটা নিয়ে কথা বলা যাবে। ওকে?’
শাহেদ মাথা নেড়ে জানাল, ওকে।
‘তাহলে শুরু করা যাক, কি বলেন?
শাহেদ আবারো মাথা নাড়ল।
একটু থেমে কী বলবে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে নাতাশা শুরু করল কথা বলা। ‘গত সাত বছর ধরে আমি কানাডায় আছি। কম্পিউটার সাইন্সে গ্রাজুয়েশন করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছি একটা ফার্মে। চার বছর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। একটা ক্যানাডিয়ান সাদা ছেলের সাথে। বিয়েটা বছর খানিক টিকেছিল।’
শাহেদের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
‘আপনি নিশ্চয়ই কিউরিয়াস বিয়েটা বেশীদিন কেন টেকে নি, তাইনা?’
শাহেদ মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
‘সেটা না হয় পরেই জানবেন, অবশ্যই যদি আপনার সঙ্গে আবারো দেখা কিংবা কথা হয়। তবে এটুকু বলতে পারি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ভালবাসা একটু কম হলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু একে অপরের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বাস থাকাটা খুবই জরুরী।’ একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার বলল, ‘এক সাথে পড়তে যেয়ে বন্ধুত্ব হল। বন্ধুকে বিয়ে করলাম—অথচ বিয়ের পরে বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে গেল। হি ওয়াজ চিটেড অন মি।’
শাহেদ কোন মন্তব্য করল না। চুপচাপ শুনে গেল।
নাতাশা বলে চলল, ‘গত তিন বছরে অনেক প্রস্তাব এসেছে, আমি আর বিয়ে করব না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আব্বু-আম্মুর কন্টিনিউয়াস রিকোয়েস্টে শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম। তাই দেশে আসা, পাত্রের সন্ধানে। যদি ক্লিক করে যায়। ইউ নেভার নো।’
শাহেদ তাকাল।
নাতাশা সাথে সাথেই বলল, ‘আই মিন, যদি কাউকে পছন্দ হয়ে যায়। তবে এই মুহূর্তে বিয়েটা হবে শুধুই… উমম, একচুয়ালি ফরমালিটিজগুলো আপনি এজাজ কিংবা জামান ভাইয়ের কাছ থেকেই জেনে নিতে পারবেন। তারচেয়ে বরং—এবার আপনার কিছু কথা শুনি, কী বলেন?’
শাহেদ নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, ‘জি!’
নাতাশা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘আর ইউ ওকে? আপনাকে এত নার্ভাস লাগছে কেন? উড ইউ লাইক টু হ্যাভ অ্যা গ্লাস অফ ওয়াটার? পানি খাবেন?’
‘না, না। পানি খেতে হবে না। আই অ্যাম ওকে।’
‘আর ইউ শিওর?’
‘ইইয়েস, আই’ম শিওর।’
‘ওয়েল, দেন লেট’স গেট ব্যাক টু বিজনেস। টেল মি সামথিং অ্যাবাউট ইয়োরসেলফ।’
এবার শাহেদ সত্যি সত্যিই নার্ভাসবোধ করল। সে আমতা আমতা করে বলল, ‘পানি খাব।’
নাতাশা শব্দ করে হেসে ফেলল। শাহেদ অস্বস্তি নিয়ে তাকাল তার দিকে। নাতাশা বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিল শাহেদের দিকে। শাহেদ ঢক ঢক করে পানি খেয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখল।
নাতাশা তাকাল শাহেদের দিকে। শাহেদ বলল, ‘থ্যাংকস।’
‘ওয়েলকাম।’ ঠিক আছে, চলুন তাহলে শুরু করা যাক। ‘বলুন।’
শাহেদ অবাক হয়ে তাকাল। যেন সে ভিনগ্রহের কারো সামনে বসে আছে। সে কিছু বুঝতে পারছে না, তার সামনে বসা ভিনগ্রহের মেয়েটি কী বলছে।
নাতাশা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘বিদেশে যেতে চান কেন?’
শাহেদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

