কোন কথাই যেমন লুকানো থাকে না। শাহেদের বাবা-মাও এক সময় জেনে গেলেন, শাহেদকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়েছে এবং সে প্রতারিত হয়েছে। রাকিবউদ্দিন সাহেব ভীষণভাবে মর্মাহত হলেন। তিনি জরুরিভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসলেন। বসার ঘরে শাহেদকে রাকিব সাহেবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে কাঁচুমাচু হয়ে। রাকিবউদ্দিন সাহেব তাকালেন শাহেদের দিকে। তারপর বললেন, ‘দেখো শাহেদ, তোমাকে আগেই বলছিলাম, যা করবে ভেবেচিন্তে করবে। বুঝে শুনে করবে। বয়স কি বাড়ছে, না কমছে দিন দিন। তোমার বুদ্ধি-শুদ্ধি আর কবে হবে?’
রাকিবউদ্দিন সাহেবের অগ্নিমূর্তি দেখে শাহেদ বিচলিত বোধ করল। তার বাবাকে সে কখনও এমন রূপে দেখে নি। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন—তার চেহারাও। সোমাও মুখ কাল করে দাঁড়িয়ে আছে। রাকিব সাহেব বলে চললেন, ‘তোমাকে ট্রাস্ট করাটাই আমার ভুল হয়েছে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল তোমার মত ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। ইউ আর গুড ফর নাথিং। মাঝ থেকে কতগুলো টাকা নষ্ট হল, এখন দেশের জমি যেটুকু ছিল তাও হাতছাড়া হয়ে যাবে।’
এ পর্যায়ে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন মিসেস জাহানারা।
রাকিবউদ্দিন সাহেব তার স্ত্রীর দিকে ফিরে তাকালেন। বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছো কেন? তখন তো অনেক পটিয়েছ আমাকে। সকাল বিকেল মাথা টিপে দিতে চেয়েছ। তোমাকে প্রিভিলেজ দিয়েও আমি ভুল করেছি। তোমার মোটা বুদ্ধির কল্যাণে তোমার ছেলের বুদ্ধিও হয়েছে মোটা।’
মিসেস জাহানারা অবিশ্বাস্য চোখে তাকালেন তার স্বামীর দিকে। তারপর ঘুরে তাকালেন সোমার দিকে। সোমার মুখও হা হয়ে গেছে। তার বাবার মুখ থেকে এধরণের কথা বের হয়ে আসতে পারে সেটা তার ভাবনার অতীত। মিসেস জাহানারা এমন অপবাদ নিতে পারলেন না। তিনি উচ্চস্বরে কান্না শুরু করলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
সোমা তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছিঃ! বাবা, এভাবে কথা বলছ কেন?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব ধমকের সুরে বললেন, ‘তো কীভাবে কথা বলব? তোর কাছে এখন আমার কথা শিখতে হবে?’
সোমা আহত দৃষ্টিতে তাকাল তার বাবার দিকে। সে বুঝতে পারল এখন আর কোন কথা বলে লাভ নেই। বরং অপেক্ষা করাই ভাল। যখন তার রাগ কমবে তখন বুঝিয়ে বললেই হবে। সে চুপ করে রইল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব সোমার দিকে তাকিয়ে শাহেদকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ও যে কাজটা করল, এটা কোন বুদ্ধিমান ছেলের লক্ষণ হতে পারে না। সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া এতগুলো টাকা দিয়ে এলো। কোন এভিডেন্স নেই। লাইফ টাইম অপরচুনিটি! মাই ফুট!’
সোমা ইতস্তত করে বলল, ‘ওদের কথা না শুনে ভাইয়ার উপায় ছিল না বাবা। আচ্ছা, ধরে নিলাম, ও বোকা। তাহলে আর যে কত ছেলে প্রতারিত হল তারা সবাই কি বোকা?’
‘না কেউ বোকা না, সবাই বুদ্ধিমান। তবে গাধা, বুদ্ধিমান গাধা। লেখা পড়া শেষ করে এক একটা বুদ্ধিমান গাধা হয়েছে। দেশটা ভরে যাচ্ছে বুদ্ধিমান গাধায়।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব রাগে গজগজ করতে লাগলেন।
এই অপমান সহ্য করা শাহেদের পক্ষে সম্ভব হল না। সে দ্রুত তার বাবার সামনে থেকে সরে গেল। সোমা একবার তাকাল তার বাবার দিকে। রাকিব সাহেবও তাকালেন। শাহেদের চলে যাওয়াটা কেমন যেন লাগল।
শাহেদ সিদ্ধান্ত নিল বাসা থেকে চলে যাবে। এ বাসায় থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব না। সে জানে সকাল-দুপুর-রাতে, খাবার টেবিলে তাকে এই প্রবঞ্চনা সইতে হবে। প্রতি পদক্ষেপে তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে। শাহেদ তার রুমে ঢুকে কাপড় বদলে বের হয়ে এলো।
ঘর থেকে বের হয়ে যাবার মুখে মিসেস জাহানারা উদগ্রীব হয়ে শাহেদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি অস্থির কণ্ঠে বললেন, ‘শাহেদ, কোথায় যাস? শোন, এতরাতে বের হোস না। যাস না বাবা।’
শাহেদ এক মুহূর্ত দাঁড়াল তারপর সজোরে দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
জাহানারা চিৎকার করে ডাকলেন, ‘শাহেদ!’
…
রাত এগারটা।
শাহেদ হাঁটছে অনেকক্ষণ ধরে। সে হাঁটছে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে। উদ্দেশ্যহীন মানুষের হাঁটা। গন্তব্যহীন যাত্ৰা। এত রাতে সে কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না। এ ধরণের হাঁটাহাঁটি অনেকেই করে থাকে—যখন কেউ কোন হিসাবে মিলাতে ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তায় নেমে পড়ে। তবে সব উদ্দেশ্যহীন হাটাই একটা গন্তব্যে যেয়ে শেষ হয় এক সময়। শাহেদেরও হল। সে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল, সে দাঁড়িয়ে আছে সুজনের বাসার সামনে। দু’কামরার একটা টিনশেড বাসায় সুজন আর তার রুমমেট ভাড়া থাকে তাদের আবাসিক এলাকার কাছেই নির্মাণাধীন একটা বিল্ডিং-এর পাশেই।
সদর দরজায় তালা ঝুলছে। সুজন বাসায় নেই। শাহেদ স্তম্ভিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মত। সে অসহায় বোধ করতে লাগল। সে সুজনের ফোনে একবার ফোন করল, কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে সুজন ফিরল। সে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, শাহেদ বসে আছে তার দরজার সামনের সিঁড়িতে। সুজন দ্রুত এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘শাহেদ? এত রাতে তুমি এখানে, কী ব্যাপার?’
‘মনটা একটু খারাপ, তাই ভাবলাম আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলি, যদি মনটা ভাল হয়।’
‘আমার সাথে কথা বলে মন ভাল করবা। আরে এটাতো খুব সুন্দর কথা।’ সুজন বিস্ময় প্রকাশ করল।
শাহেদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনার মোবাইলে ফোন করলাম কয়েকবার, ফোন ধরলেন না—আপনার আগের নাম্বারটা নাই না কি আর?’
‘আর বইল না, একটা ঝামেলা হয়েছিল, আরেকটা নতুন ফোন নিছি।’ বলতে বলতে ঘরের তালা খুলে সুজন বলল, ‘আস ভিতরে আস।’
শাহেদ ভেতরে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
সুজন বলল, ‘এখন বল, তোমার বাসার সবাই কেমন আছে?’
‘আছে, মোটামুটি ভালই।’
শাহেদকে ভাল মত লক্ষ করে সুজন বলল, ‘তোমাকে তো কাহিল লাগছে খুব। ঘটনা কী?’
শাহেদ নিরুত্তর রইল।
‘আচ্ছা, ঘটনা পড়ে শোনা যাবে। তুমি একটু বস, আমি চট কইরা ঠাণ্ডা পানিতে ভালমতো একটা গোসল দিয়া আসি। তারপর না হয় তোমার সাথে কথা বলা যাবে, কি বল?’
শাহেদ মাথা নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
কথা বলতে বলতে শাহেদের সামনেই জামা খুলে, একটা লুঙ্গি পরে উদোম গায়ে সুজন ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
শাহেদ চুপচাপ বসে রইল—গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে। কিন্তু তার সব ভাবনাগুলোই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
সুজন বালতি থেকে মগে করে গায়ে পানি ঢেলে গানের সুর ধরল, আমার হার কালা করলাম রে, ও আমার দেহ কালার লাইগা রে…’
শাহেদ নিবিষ্ট মনে সুজনের ভেসে আসা গান শুনতে লাগল। শাহেদ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, সুজনের গানের গলা ভাল। শুধু ভাল বললে কম বলা হবে—বেশ ভাল।
…
মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।
মিসেস জাহানারার কান্না থামে নি। সে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে চলেছেন। ‘ছেলেটাকে এভাবে বকাঝকা না করলে হত না। এত রাতে কোথায় গেল?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘যাবে আর কোথায়, রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ঠিকই ফিরে আসবে।’
জাহানারা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘যদি না ফেরে?’
‘না ফিরলে না ফিরবে। ওতো আর কচি খোকা নয়।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আর তাছাড়া আমি তো ওকে বাসা থেকে চলে যেতে বলি নি। বলেছি?’
‘তোমার ভয়েই তো-’ কথা শেষ না করে জাহানারা বেগম কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিলেন।
রাকিবউদ্দিন সাহেব বিরক্তমুখে বললেন, ‘কী আশ্চর্য, তাই বলে আমি কি কিছুই বলতে পারব না? এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, অথচ আমি কিছুই বলতে পারব না!’
সোমা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে। ভেতর থেকে তাঁর বাবা-মায়ের ঝগড়া ভেসে আসছে ক্ষণে ক্ষণে। হঠাৎ করেই এক ধরণের শূন্যতা ভর করল তাঁর শরীরে। সে মন খারাপ করে দূর আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
…
গভীর রাত।
আজকের রাতটা সুজনের এখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাহেদ।
সুজনের ঘরে ছোট ছোট দু’টো কাঠের খাট পাতা দু’কোনায়। সুজন আর শাহেদ দু’জন দু’খাটে শুয়ে আছে। দু’জনেই চুপচাপ তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। নীরবতা ভেঙে সুজন বলল, ‘শাহেদ?’
‘উ।’
‘তুমি কি কিছু বলতে আসছিলা?’
‘হু।’
‘প্রেম ভালবাসা সংক্রান্ত?’
‘না।’
‘অন্য কোন ব্যাপার?’
‘হু।’
‘কি ব্যাপার?’
শাহেদ নিশ্চুপ।
‘তোমার কি কোন সমস্যা হয়েছে?’
‘না।’
সুজন ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘যন্ত্রণা হল দেখি, সব কথার উত্তর এক অক্ষরে দিচ্ছ কেন? এত সংক্ষেপে উত্তর দিলে তো কিছু বোঝা যাবে না।’
শাহেদও ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘বাদ দিন আমার কথা। আপনার কথা বলেন- কী করছেন ইদানীং?’
‘কী আর করব, ধান্ধাবাজি করছি। চাকরি-বাকরি তো হল না।’ সুজনের কণ্ঠে হতাশা ফুটে উঠল।
‘কী রকম শুনি?’ শাহেদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
‘জমি বেচা কেনা করি।’
‘জমি বেচা কেনা মানে?’
‘মানে একজনের জমি আর একজনের কাছে বিক্রি করি। ইংরেজিতে যাকে বলে ব্রোকার, বাংলায় বলে দালাল। মাঝখান থেকে আমি কিছু টু-পাইস কামিয়ে নেই। ব্যবসা খারাপ না।’
‘তাই। বলেন কী?’
‘দুবাইওয়ালাদের কারণে ব্যবসাটা খুব রমরমা হয়েছে বুঝলা। হঠাৎ করে কিছু মানুষের হাতে টাকা পয়সা হয়েছে, তারা টাকাটা দিয়ে কি করবে বুঝতে পারে না। তখন জমির টোপ ফেলতে হয়।’
‘টোপ ফেলতে হয় মানে?’
‘কাল চল আমার সাথে, একটা পার্টির কাছে নিয়ে যাব। নিজের চোখে দেখবা। টোপ ফেলেছিলাম সপ্তাখানেক আগে। পার্টি টোপ গিলে ফেলেছে। এখন শুধু সুতা ছাড়ছি। কাল গিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, সুতা ছিঁড়ে যাবে না মাছ তোলা যাবে।’
‘সুজন ভাই, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলছেন, এসব। পার্টি, টোপ, সুতা ছাড়া, কী এসব?’
‘বললাম তো, সাথে চল তখন দেখবা। যাবা আমার সাথে?’
‘না সুজন ভাই, আমার অন্য কাজ আছে। আপনার সাথে নাহয় আর একদিন যাব।’
‘ঠিক আছে। তাইলে এখন বল, তোমার কথা শুনি।’
‘আমি কি আপনার এখানে দু’একটা দিন থাকতে পারি?’
‘আরে দু’একদিন কেন? তোমার যে কয়দিন ইচ্ছা থাক। এইটা কোন ব্যাপার?’ বলতে বলতে সুজন অন্যদিকে ঘুরে চোখ বন্ধ করল এবং মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সুজন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। নিশ্চিন্ত মানুষের ঘুম। এত দ্রুত কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
শাহেদের চোখে ঘুম নেই। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে।
…
লিফট থেকে নেমে রাজনের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল সোমা। ডোরবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ খুলছে না দেখে আশে পাশে তাকিয়ে সোমা নিশ্চিত হল—এটা সেই ফ্ল্যাটই। সেদিনের সব কথাই তাঁর মনে আছে। কাজেই ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। সে আবারো ডোরবেলে চাপ দিল।
দীর্ঘ সময় পার করে একজন অপরিচিত যুবক দরজা খুলে দিল। দরজার ফাঁক গলে একজন স্বল্প বসনা মেয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল যুবকের পাশে। যুবকের ঠোঁট এবং চিবুকে লিপস্টিকের দাগ। যুবক-যুবতীর রোম্যান্টিক টাইম-পাসের মধ্যে সোমা এসে পড়েছে কি না কে জানে। সোমা কিঞ্চিত ধাক্কা মত খেল। সে দ্রুত চারিদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, সে কি ভুল জায়গায় এসে পড়েছে কি না। দরজার ফাঁক গলে যতটা দেখা গেল, ভেতরের সব কিছুই সোমার পরিচিত মনে হল।
যুবকের প্রশ্নবোধক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে সোমা বলল, ‘রাজন আছে?’
‘রাজন তো এখানে থাকে না।’
‘এটা রাজনের ফ্ল্যাট না?’
‘না, এটা লিটনের ফ্ল্যাট!’ বলেই ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি দিল।
সোমা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘মানে?’
‘না না কিছু না। না, এটা রাজনের ফ্ল্যাট না।’
‘ও এখানে থাকে না?’ সোমা দ্বিধায় পরে গেল।
‘না। এটা আসলে আমাদের এক বন্ধুর বাসা। মাঝে মাঝে আমরা এসে সময় কাটাই।’ ছেলেটি তাঁর বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর সোমার দিকে ঘুরে সৌজন্য রক্ষার্থে বলল, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’
‘না, ঠিক আছে। ভেতরে আসতে হবে না।’ সোমা ইতস্তত কণ্ঠে আবার বলল, ‘রাজন কোথায় আছে বলতে পারেন?’
উত্তর না দিয়ে যুবক পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কিছু যদি মনে না করেন, আপনি কি সোমা?’
‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’
‘রাজন কোথায় আপনি জানেন না?’
সোমা বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘না!’
‘আপনাকে কিছু বলে যায় নি?’
‘কেন, কোথায় গেছে রাজন?’ সোমার কণ্ঠে ভয় এবং শঙ্কা ফুটে উঠল পরিষ্কারভাবে।
যুবক আবার তাকাল তাঁর বান্ধবীর দিকে। তাঁরা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘আপনি কিছুই জানেন না?’
‘না। সত্যিই কিছু জানি না।’ সোমা ভয় পেল। ভয়ংকর কিছু শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করল।
‘ও তো আমেরিকায় চলে গেছে। গত সপ্তাহে।’
অস্ফুটে বলল সোমা, ‘জি?’
‘আপনি জানেন না? আশ্চর্য!’ ছেলেটি আরো অনেক কিছুই বলল কিন্তু সোমার কানে সেসব কোন কথাই আর পৌঁছল না। হঠাৎ করে তাঁর মাথাটা ঘুরে উঠল। মনে হচ্ছে এখনি সে পড়ে যাবে। দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিল। একটু স্থির হয়ে কোনরকমে নিজেকে সংযত করে বলল, ‘সরি আপনাদের ডিস্টার্ব করলাম। আসি।’
সোমা যত দ্রুত সম্ভব হেঁটে গিয়ে লিফটের বাটনে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
সোমা উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছে। তার পা এলোমেলো। সমানে ঘামছে সে। তার চোখ ফেটে কান্না বের হয়ে আসছে। শত চেষ্টা করেও আটকে রাখতে পারছে না কান্নার অঝোর ধারা। সোমার ইচ্ছে হচ্ছে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে। বুকের ভেতর চাঁপা কষ্ট উথাল-পাতাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে। তার এমন লাগছে কেন?
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৬)
with
no comment

