শাহেদ বলল, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না কী করব?’
‘হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো কিছুই হবে না।’ ইমরান সাহস দিয়ে বলল, ‘ঐ ব্যাটাদের ধরতে হবে, চলুন।’
‘ওরা নেই। অফিসে তালা ঝুলিয়ে ভেগেছে।’ শাহেদের নির্লিপ্ত উত্তর।
‘তাহলে?’ ইমরান রীতিমত মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘আমি তো ভাই শেষ।’
‘শেষতো আমিও।’ বলল শাহেদ।
‘কিন্তু এভাবে এদেরকে তো ছেড়ে দেয়া যায় না।’
‘কিন্তু কীইবা করার আছে? কোথায় খুঁজব? এদিকে লজ্জায় কারো কাছে বলতেও পারছি না। নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছে। এতটা বোকামি কেউ করে? ছিঃ!’ শাহেদ নিজেকে ধিক্কার দিল।
ইমরান বলল, ‘নিজেকে এতটা ছোট ভাববেন না। ইট’স নট ইয়োর ফল্ট। আপনি এবং আমি—আমরা দু’জনেই পরিস্থিতির স্বীকার। আমাদের দোষ কোথায় বলুন?’
‘দোষ কোথায় জানি না, তবে যে শোনে সেই বলে, তুমি কি গাধা নাকি? এমন বোকামি কেউ করে?’ শাহেদ হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘সারাক্ষণ গাধা শব্দটি শুনতে শুনতে নিজেকে গাধা গোত্রীয় কেউ মনে হচ্ছে।’ একটু থেমে শাহেদ আবার বলল, ‘আচ্ছা কেউ কি ইচ্ছে করে গাধা হতে চায়, বলুন?’
‘শাহেদ, ভুলটা যদি আমি কিংবা আপনি একা করতাম তাহলে ধরে নিতাম আমরাই গাধা। গাধা হওয়া কোন মানুষেরই পছন্দ নয়, তবু মানুষ অহরহ গাধা হয়, হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা কিন্তু আমাদের মত আরও শত ছেলের সর্বনাশ করেছে ইতোমধ্যে এবং করছে প্রতিদিন।’
শাহেদ সম্মত জানিয়ে মাথা নাড়ল।
ইমরান অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘দেশটা চলে গেছে ঠগবাজ আর প্রতারকদের দখলে। আরও কতজন কতধরণের ফাঁদে পড়ছে, ঠকছে, প্রতারিত হচ্ছে—কে জানে?’
…
ঢাকা শহরের একটি ঘনবসতি আবাসিক এলাকা।
একটা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল সুজন। তার পড়নে স্যুট, সাদা শার্ট, নীল স্ট্রাইপড টাই, হাতে একটা ব্রিফকেস। এই সুজনের সাথে মোড়ের চায়ের দোকানে বসে থাকা সুজনের আকাশ-পাতাল তফাৎ। তার বেশভূষায় বলে দেয়া যায় সে একজন পেশাদার লোক। সুজন একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। খাটি বাংলায় জমির দালাল।
ফ্ল্যাটের নাম্বার মিলিয়ে ডোরবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুজন। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দিল একজন ষাটোর্ধ ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের নাম বদরুল হক।
‘স্লামালাইকুম।’ সুজন সালাম দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়াল।
‘ওয়ালাইকুলস্লাম। সালামের উত্তর দিয়ে বদরুল সাহেব বললেন, ‘আপনি, আপনাকে তো চিনলাম না?’
‘আঙ্কেল, আমার নাম সুজন জোয়ারদার। রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। শুনলাম আপনি প্লট কিনতে চান?’
বদরুল সাহেব বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কার কাছে শুনলেন?’
‘কার কাছে শুনলাম, সেটা তো আঙ্কেল জরুরী না। জমি কিনবেন কি না সেটাই জরুরী। যদি বলেন, না- কথা না বাড়িয়ে চলে যাব। যদি বলেন, হ্যাঁ- তাহলে বসব, আলোচনা হবে।’
সুজনের কথার ধরণে বদরুল সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘প্লট কোথায়?’
‘এখানে দাঁড়িয়ে তো সব কথা বলা যাবে না, আঙ্কেল। প্লট কোথায়, কত কাঠার, বিস্তারিত সবই জানবেন।’ সুজন তার হাতের ব্রিফকেস উঁচু করে ধরে বলল, ‘এখানে সব ইনফরমেশন আছে। যদি বসতে বলেন, তাহলে ডিটেইল আলাপ করা যাবে। সবকিছু পছন্দ হলে, দরদামে বনিবনা হলে, বায়নার টাকা দিবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে জমি আপনার নামে রেজিস্ট্রি হয়ে যাবে।’
‘আসেন, ভিতরে আসেন।’ বদরুল সাহেব দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন।
সুজন গলার টাইয়ের নট আলগা করতে করতে ভেতরে ঢুকে সোফায় গিয়ে বসল।
…
সোমা ক্লাস শেষে একা একা বসে আছে একটা নিরিবিলি জায়গায়। বিষণ্ণতা ঘিরে আছে তাকে। তার চোখজুড়ে হতাশা। ইতোমধ্যে সে বেশ কয়েকবার রাজনের মোবাইল ফোনে কল করেছে। তবে তার ভাগ্য তাকে সহায়তা করে নি। প্রতিবারই তাকে শুনতে হয়েছে, দুঃখিত, কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরি, দ্য নাম্বার ইউ ডায়াল্ড ইজ আনরিচ্যাবল।
সোমার একাকীত্বের ব্যাঘাত ঘটিয়ে তার বন্ধুরা একযোগে এসে যোগ দিল তার পাশে। ইরা বলল, ‘এই যে তুই এখানে, আর আমরা তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ফোন ধরছিস না কেন?’
সোমা অবাক হয়ে বলল, ‘ফোন করেছিলি?’
‘হ্যাঁ…’ ইরা বলল, ‘তোর ঘটনাটা কী? কী হয়েছে?’
সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘কিছু হয় নি।’
‘কিছু তো অবশ্যই হয়েছে।’
ইরাকে সমর্থন জানিয়ে সিন্থিয়া বলল, ‘রাজন ভাইকে দেখছি না ইদানীং। ঝগড়া টগরা করেছিস নাকি? ব্যাপারটা কী?’
সোমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ব্যাপারটা যে কী, আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর মোবাইলে কল যাচ্ছে না।’
‘তাহলে তো চিন্তার কথা।’
বাপ্পীও সায় দিয়ে বলল, ‘আসলেই চিন্তার কথা। তুই রাজন ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিস কখনো?’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘কেন?’
‘না, মানে- উনার বাসায় গিয়ে একবার খোঁজ নিয়ে দেখলে হত না?’
‘হ্যাঁ। তাই নেব ভাবছি।’
‘যদি কোন হেল্প লাগে বলিস।’
‘বলব।’
ইরা বলল, ‘ও যার জন্যে তোকে খুঁজছি—সজল বাজীতে হেরেছে, ও আমাদের সবাইকে ফুচকা খাওয়াবে। চল।’
‘না রে, আমার ইচ্ছে করছে না। আমি বাসায় চলে যাব। তোরাই যা।’
সজল বলল, ‘আরে ধুর চল তো। আচ্ছা, তোর কি মন খারাপ করা মানায়? আর তুই এমন একটা ভাব করছিস যেন রাজন ভাই তোকে ডাম্প করে অন্য কোথাও চলে গেছে।’
সোমা শান্ত চোখে তাকাল সজলের দিকে। সে আয়ত চোখের ভেজা দৃষ্টি আর বুজে আসা গলায় থেমে থেমে বলল, ‘জানি রে। কিন্তু আমি কী করব? আমি ওর ইগ্নোর্যান্সটা নিতে পারছি না। এভাবে ইগ্নোর করার মানে কী? কী করেছি আমি?’
বাপ্পী বলল, ‘তুই ভাবিস না। দরকার হলে আমি আর সজল তাকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসব। এক কাজ করি চল, কাল ক্লাস শেষে আমরা সবাই মিলে তার বাসায় হানা দেই। এখন চল তো।’
বাকীরা সমস্বরে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ চল।’
সোমাকে প্রায় জোর করেই টেনে নিয়ে চলল ওরা সবাই মিলে।
…
শাহেদ আর ইমরানের মধ্যে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে অল্প সময়ের মধ্যেই। শাহেদের সব কথা শুনে ইমরান বলল, ‘সোমাকে বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার বলে মনে হচ্ছে। তোমাকে অনেক হেল্প করেছে তাইনা? মেয়েটা বেশ ভাল।’
‘অবশ্যই ভাল। শুধু ভাল বললে কম বলা হবে। আই এম সো ফরচুনেট দ্যাট আই হ্যাভ অ্যা সিস্টার লাইক হার।’
‘তা তো বটেই, এমন একটা বোন থাকা তো আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার।’ ইমরান সমর্থন করল।
তারপর হঠাৎ করেই নীরবতা নেমে এলো। বেশ কিছুক্ষণ পর শাহেদ কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘সো হোয়াট’স ইয়োর স্টোরি?’
‘মানে?’ ইমরান ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
‘মানে, আপনি কিভাবে এদের পাল্লায় পড়লেন?’
‘এই তো একই ভাবে, পত্রিকায় অ্যাড দেখে। ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলাম, পরিচয় হল সোনিয়ার সাথে। আই মিন তোমার নাতাশার সাথে।’
‘ভালই, একই পাত্রী কারো জন্যে নাতাশা, কারো জন্যে সোনিয়া।’
‘তারপর, মিজান আর মাহবুবের কাছে টাকা দিলাম প্রায় সাড়ে তিন লাখের মত।’
‘মিজান? মাহবুব?’
‘মানে, এজাজ আর জামান। সেম পারসন, ডিফারেন্ট নেম। চরিত্র একই, শুধু নাম আলাদা।’
‘হুম। তারপর?’
‘সোনিয়ার সাথে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হল। বিয়ের ঠিক একদিন আগে সোনিয়া হঠাৎ করে বলল, ওর বাবা অসুস্থ। ওকে ইমিডিয়েটলি চলে যেতে হবে। একমাসের মধ্যেই ফিরে এসে আমাদের বিয়ে হবে, এই বলে ও চলে গেল। তারপরের ঘটনা তো…’
‘জানি। বলতে হবে না।’ বলতে বলতে শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে শাহেদ আর ইমরান প্লান করে ফেলল।
ইমরান বলল, ‘এখন থেকে প্রতিদিন আমাদের কাজ হবে, ঢাকা শহরে যতগুলি ম্যারেজ মিডিয়া আছে সেগুলোর এড্রেস বের করে খুঁজে দেখা। ফ্রড দু’টোকে কোথাও না কোথাও ঠিকই পাওয়া যাবে।’
শাহেদ বলল, ‘আমি পত্রিকার অ্যাডগুলো থেকে ফোন নাম্বার কালেক্ট করে সব নাম্বারে কল করব। ওদের কণ্ঠস্বর আমার মুখস্থ। ধরা ওদের পরতেই হবে।’
‘ঠিক আছে, কাল আবার আমরা দেখা করব।’
‘ওকে।’
শাহেদ আর ইমরান বেড় হয়ে গেল রেস্টুরেন্ট থেকে।
…
রাকিবুদ্দিন সাহেবের অভ্যাস রাতের খাবার শেষে আয়েশ করে একটি পান চিবুনো। রাকিব সাহেবের পান খাওয়াটা তার স্ত্রীর পছন্দ নয়, কিন্তু তার পান খাওয়ার পেছনে হাজারো যুক্তি আছে। এই যেমন, পানের রস স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। ভিটামিন সি আছে। হজমের সহায়ক। পানের রস হজমে সাহায্য করায় তা পেটে বদ গ্যাস তৈরিও রোধ করে। খুব কম লোকেই জানে, পানে যে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল প্রপার্টি আছে। পানে প্রচুর মাত্রায় ক্লোরোফিল থাকে৷ এইজন্য পানের রস ওষুধের মত কাজ করে৷
মিসেস জাহানারার যখনই কোন প্রয়োজনীয় কথা বার্তা থাকে, সে পানের ডালা সাজিয়ে তার স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জাহানারা পানের ডালা নিয়ে এসে দাঁড়াল আজ। তারমানে আজ তার কোন জরুরী বিষয় আছে যা তিনি তার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করতে চায়। সে পান বানিয়ে রাকিব সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিতেই তিনি বললেন,
‘আজকের আলোচনার টপিক কী?’
মিসেস জাহানারা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘সোমার কি হয়েছে কিছু জান?’
‘কেন ওর আবার কি হয়েছে?’
‘কেন তুমি লক্ষ কর নি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন, ‘না করি নি। ব্যাপারটা কী? খুলে বল।’
‘সোমা হঠাৎ করে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর সেই হাসি খুশি উচ্ছলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মেয়েটা কেমন যেন মন খারাপ করে থাকে সবসময়।
‘কই আমার কাছে তো তেমন কিছু মনে হয় নি।’
‘ইদানীং প্রায়ই ক্লাস মিস করছে। সারাদিন দরজা আটকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘এ বয়সে মেয়েদের কতকিছুর সমস্যা হয়, আবার মিটেও যায়। এ নিয়ে এত ভাবতে হবে না। দেখ, প্রেম ট্রেম করছে কিনা।’
‘প্রেম-ট্রেম করছে মানে? ওর কি প্রেম করার বয়স হয়েছে নাকি?’
‘আকাশ থেকে পড়লে মনে হয়? সোমার চেয়ে কম বয়সে তোমার বিয়ে হয়েছিল।’
‘কী সব বাজে কথা বল?
‘মোটেই বাজে কথা বলছি না। মেয়ে বড় হয়েছে, ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে। কারো সাথে সম্পর্ক হওয়া তো অসম্ভব কিছু না।’
জাহানারা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, ‘তেমন কিছু হলে, ও আমাকে বলত।’
‘শোনেন বেগম জাহানারা, সব মানুষেরই কিছু একান্ত কথা থাকে, সব কথা সবসময় সবাইকে বলা যায় না। এ বিষয়টা আপনাকে বুঝতে হবে।’
…
‘জমিটা পেয়েছেন?’
এই নিয়ে তৃতীয়বার প্রশ্নটা করলেন বদরুল সাহেব। প্রশ্নটা করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সুজন অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে তার ড্রয়িং রুমে। সে ধীরে ধীরে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে—কোন তাড়াহুড়ো নেই। কিন্তু বদরুল সাহেবের তর সইছে না। এর আগে সে দু’বার জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু সুজন তার ব্রিফকেস থেকে কি একটা কাগজ বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
সুজন চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘জমি তো হাতেই ছিল, কিন্তু এখন হাত ছাড়া হয়ে যায় যায় অবস্থা।’
‘হাত ছাড়া হয়ে যায় যায় মানে?’
‘আরে আপনার এখান থেকে কথা বলে গেলাম না সেদিন? গিয়ে দেখি অন্য পার্টি বাসায় এসে বসে আছে। জমির বর্ণনা শুনেই পার্টি পাঁচ লাখ বেশি অফার করল। আর করবে না-ই বা কেন? জমিতো না, একেবারে সোনার খনি। গোল্ড মাইন মিস করলেন বদরুল সাহেব, গোল্ড মাইন।’
বদরুল সাহেব বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘বলেন কী? পাঁচ লাখ টাকা বেশি অফার করল?’
‘জি। ভাবলাম খবরটা আপনাকে দিয়ে যাই।’ সুজন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘পাঁচ লাখ আজকাল কোন টাকা?’
বদরুল সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘এখন এই খবরে আমার লাভটা কী? আপনি আমাকে আগে জানাবেন না, আমি না হয় পাঁচ লাখ বেশীই দিতাম।’
‘আপনিতো রাজি হলেন না, উল্টো আমাকে সন্দেহ করলেন। একটা কথা বলি বদরুল সাহেব, সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক না। সব মানুষই কিন্তু খারাপ না। যাই হোক, এখন আর এসব বলে লাভ নাই। আমি উঠি তাহলে।’
বদরুল সাহেব বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। তিনি মুখ অন্ধকার করে ফেললেন। সুজন তার চেহারার পরিবর্তন দেখে বুঝে গেল পার্টি টোপ গিলেছে। সে বলল, ‘জানি আপনার একটু খারাপ লাগছে। তবে চিন্তা করবেন না, আমার খোঁজে আরও জমি আছে, আমি আরেকদিন এসে জানাব। যদি অনুমতি দেন তো আজ উঠি।’ বলেই সুজন চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বদরুল সাহেব ত্রস্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আরে বসেন না। আরেকটু কথা বার্তা বলি।’
সুজন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘কথা বার্তা যা বলার বলে ফেলেছি। অযথা বেশি কথা বলে তো লাভ নাই।’
‘আরে বসেন আরেকটু। রোদের মধ্যে এসেছেন, আর এক কাপ চা খান।’
‘ভাই সাহেব, বসে বসে চা খেলেতো আমার চলবে না। আমার অন্য কাজ আছে।’
‘আরে এখানে তো কাজেই এসেছেন, তাই না?’
‘কাজের কাজ তো কিছু হচ্ছে না। যাই হোক টাকা আপনার, জমি কিনবেন আপনি। দরে বনলে কিনবেন, না বনলে কিনবেন না।’
‘আহা, এত টেনসড হচ্ছেন কেন? আপনি একটু বসেন আমি আসছি।’ বলেই বদরুল সাহেব ভেতরে চলে গেলেন।
সুজন তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসল।
অল্প সময় পরেই বদরুল সাহেব ফিরে এলেন। তার পেছনে একটা কাজের মেয়ে ট্রে-তে করে দু’কাপ চা আর এক গ্লাস শরবত এনে টেবিলে নামিয়ে রাখল।
বদরুল সাহেব শরবতের গ্লাস সুজনের হাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নেন, শরবত খান। লেবুর শরবত।’
সুজন শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে ছোট একটা চুমুক দিল।
বদরুল সাহেব বললেন, ‘সুজন সাহেব, সামনের সপ্তাহে কি একবার আসতে পারবেন?’
‘কেন?’
‘না মানে, ঠাণ্ডা মাথায় আর একবার ভেবে দেখতাম আর কী।’
‘এই গরমের মধ্যে মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন কীভাবে? যত চিন্তা করবেন, মাথা তত গরম হবে।’
‘না বলছিলাম কী, আমার শ্যালকের সাথে একবার কথা বলে নেই। বুঝতেই পারছেন, যার টাকায় জমি কিনব তার মতামতটা জানা আর কী।’
‘আপনার শ্যালক যেন কোথায় থাকে?’
‘আবুধাবি।’ একটু থেমে বদরুল সাহেব বললেন, ‘আপনি প্লিজ আসেন আরেকবার। আমি আপনার আসা-যাওয়ার খরচ দিয়ে দিচ্ছি। এই নিন।’’ বদরুল সাহেব মানিব্যাগ বেড় করে দুটো একশো টাকার নোট বের করে সুজনের দিকে এগিয়ে দিলেন।
সুজন ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘এটা কী দিচ্ছেন আঙ্কেল? আমি তো আপনার কাছে ভিক্ষা করতে আসি নাই। টাকাটা আপনে রেখে দেন। আজ উঠি, স্লামালাইকুম। শুধু শুধু আপনাকে বিরক্ত করলাম!’ বিরক্ত ভঙ্গিতে সুজন উঠে দাঁড়াল।
বদরুল সাহেব সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আরে বসেন না আর একটু। এত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন? এক মিনিট। এক মিনিট।’
বদরুল সাহেব দ্রুত ভেতর থেকে একটা পাঁচশত টাকার নোট এনে সুজনের হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নেন। সামনের সপ্তাহে আসেন, দেখি একটা ডিল করা যায় কিনা।’
সুজন টাকাটা আলোর দিকে ধরে একটু পরীক্ষা করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘আঙ্কেল, আপনি মনে হয় আমার কথা বুঝতে পারেন নাই। আমি বোধ হয় আপনাকে বুঝাতে পারি নাই যে অন্য পার্টি পাঁচ লাখ টাকা বেশি অফার করে টাকা নিয়ে বসে আছে।’
বদরুল সাহেব তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি পাঁচ লাখ বেশীই দেব।’
‘কিন্তু সেটা তো এখন আর সম্ভব না।’
‘কেন, সম্ভব না কেন?’
‘যিনি জমিটা নিতে চান, সে আমার বন্ধুর বড় ভাই। আমেরিকায় থাকে। দেশে এসেছে কিছুদিন হল। বুঝতেই পারছেন, টেকনিক্যাল ব্যাপার। নিতে হলে আপনাকে মিনিমাম আরো এক বেশি দিতে হবে।’
বদরুল সাহেব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন সুজনের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনি তো আমাকে মহা চিন্তায় ফেলে দিলেন। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি আরো এক বেশীই দেব।’
সুজন নিশ্চিত হবার জন্য বলল, ‘মানে ছ’লাখ।
‘হ্যাঁ, ছ’লাখ।’
সুজনের ইচ্ছে হল বলতে যে সেই পানি খাইলেন, তবে ঘোলা কইরা খাইলেন। হায়রে বাঙ্গালী! কিন্তু তা না বলে সে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি জানতাম আপনি রাজি হবেন, তবে সময়টা একটু বেশি নিলেন আর কী?’
‘সময় তো একটু লাগেই। এইসব কথা কি আর এক কথায় হয়। লাখ টাকার ব্যবসা এক কথায় হয় কী করে?’
‘হলে এক কথাতেই হয়, না হলে লাখ কথাতেও হয় না। আমি আগামী সপ্তাহে আসব, আপনি বায়নার টাকা রেডি রাখবেন।’
‘কোন চিন্তা করবেন না। টাকা রেডি থাকবে।’
সুজন সন্তুষ্ট চিত্তে বদরুল সাহেবের বাসা থেকে বেড় হয়ে গেল।
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৫)
with
no comment

