Farhad-Hossain-Jojon-Jojon-Dhur-Book-Review

‘যোজন যোজন দূর’-এর আদ্যোপান্ত

একটি উপন্যাস যখন স্রেফ গল্পনির্ভর হয়, তা অনেকটা নরোম ভাতের মতো লাগে। সহজ বাংলায় যাকে আমরা জাউ ভাত বলি। কোনোরকমে উদরপূর্তি। কিন্তু গল্পের সাথে সাথে যখন চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ইত্যাদি পাওয়া যায়, তা হয় সবজি-ভাতের মতো। খেতেও সুস্বাদু, একই সাথে পুষ্টির যোগানও হয়। লেখক ফরহাদ হোসেন-এর সকল গল্প-উপন্যাসেই ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তাঁর নতুন প্রকাশিত উপন্যাস ‘যোজন যোজন দূরে’ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে।

গল্পের সাথে সাথে তিনি রিলেটেড সকল স্থানের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। আমেরিকার বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনার তথ্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।

উপন্যাসটি মূলত আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের বিচিত্র জীবনাচার ও সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে রচিত। দূর থেকে বাঙালিদের কাছে আমেরিকা মানেই সুখ ও স্বচ্ছলতার আলো ঝলঝলে জীবন। কিন্তু বাস্তবতা এতোটা সহজ নয়। সেখানে টিকে থাকতে কঠিন যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, এবং ফলস্বরুপ নানান জটিলতা দেখা দেয়। অবৈধ বসবাস, ডিপোর্টেশন, পারিবারিক অশান্তি ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত আমেরিকার বাঙালিরা। বাঙালিদের এরূপ জটিলতার সাথে সাথে আমেরিকানদের চরিত্রের ক্রস পলিনেশনও লেখক প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, টিভির পর্দায় কোনো বিদেশি প্লটে লেখা নাটক দেখছি। আমরা যারা বিটিভির যুগে জন্মেছি, তারা এই উপন্যাসটি পড়লে স্মৃতিকাতরতায় ভুগবেন। মনে হবে, সেই কিশোর বয়সে দেখা বহুল চরিত্রের নাটক, যেসব নাটকের দৃশ্য বিদেশের চমৎকার ও আকর্ষণীয় স্থানে চিত্রায়িত হতো।

টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত শহর ডালাসের বাঙালি কমিউনিটিতে জনপ্রিয় নাম ফরিদ হাসান। তাকেই এ উপন্যাসের মূল চরিত্র করা হয়েছে। মূল চরিত্র বলে নয়, লেখক এ চরিত্রকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন- তাতে করে ফরিদকে উপন্যাসের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র দাবি করতে আমার কোনো কার্পণ্য নেই। ফরিদের চরিত্রের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। সোসাইটির যে কারো সমস্যার সমাধানে ফরিদ সর্বদা তৎপর। অন্যের সমস্যার সমাধান করতে করতে একসময় তার নিজের জীবনই চরম জটিলতার মধ্যে পড়ে যায়। পারিবারিক ভাঙনের কবলে ফরিদের পরিবার- এ দুঃসময়েও সে অন্যের বিপদের ডাকে সাড়া দেয়। ফরিদের চরিত্রের সাথে প্রিয় অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর খুব সাদৃশ্য পেয়েছি। যেন লেখক তাকে সামনে বসিয়েই চরিত্রটি সাজিয়েছেন। আমার ধারণা- জীবিত থাকলে স্বয়ং হুমায়ূন ফরিদীও দ্বিধান্বিত হতেন, লেখককে প্রশ্ন না করে পারতেন না!

উপন্যাসটিতে লেখক বহুল চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সাবের, স্বপন, রাশেদ, মিতু ইত্যাদি চরিত্রগুলোর বিচিত্র জীবনবৈচিত্রের পাশাপাশি মূল ঘটনার বর্ণনা সুনিপূণভাবে উপস্থাপন করছেন। পারিপ্বার্শিক চরিত্রগুলো আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন জীবনবৈচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়। মিতু চরিত্রটিকে খুবই ভালো লেগেছে। ভেতরে দুঃখ পুষেও সে বাইরে সবসময় চঞ্চল। অন্যদিকে রেশাদ চরিত্রটি একেবারেই উল্টো। সে ভেতরে-বাইরে সবসময়ই অস্থির। সবার থেকে নানান কৌশলে আর্থিক সুবিধা আদায় করাই তার একমাত্র কাজ। আপাতদৃষ্টিতে চরিত্রটি নেগেটিভ হলেও তার কথা-বার্তার ধরনে তাকে খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এখানে লেখকের দক্ষতার প্রশংসা না করলেই নয়। এতো চরিত্রের সমাহার উনি ঘটিয়েছেন, অথচ প্রতিটি চরিত্রই স্পষ্ট এবং কোথাও কোনো অতিকথন নেই। ১৭৪ পৃষ্ঠার মেদহীন, পরিপাটি একটি উপন্যাস। একদিকে ফরিদ-রুমা দম্পতি, অন্যদিকে রিয়া-মুরাদ দম্পতির টানা-পোড়েনে তাদের সন্তানরা মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়। পারিবারিক ভাঙন সন্তানদের উপর কী ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে, এ উপন্যাসে তা স্পষ্ট হয়েছে। গল্পের একপর্যায়ে নাটকীয়ভাবে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ যুবক ডেভিডের আগমন ঘটে। রিয়ার সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব মুরাদকে অস্থির করে তুলে। সে তার লাগামহীন জীবনের আচমকা লাগাম টেনে রিয়ার কাছে ফিরতে চায়। এখানে রিয়া আর মুরাদের রয়াসন চমৎকার। ভালোবাসলে হাজার অপরাধও তুচ্ছ করে ক্ষমা করা যায়। আসলে ভালোবাসা যত্নে বাড়ে। যে যত্নের অভাবে রুমাও দিন দিন কঠিন থেকে কঠিন হয়েছে । এই কাঠিন্য তাকে ফরিদের থেকে এতো দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় যে, স্বামী-স্ত্রী হয়েও তারা যেন যোজন যোজন দূরের কেউ!

যারা বৈচিত্রপূর্ণ গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তারা নিঃসংশয়ে উপন্যাসটি পড়তে পারেন। এখানে পারিবারিক গল্পের পাশাপাশি পাবেন সহজাত শারীরিক-মানসিক প্রেমের আবেদন এবং আমেরিকায় বাঙালিদের জীবনযাত্রা ও ইতিহাস-ইতিহ্যের সংস্পর্শ।

‘যোজন যোজন দূর’ রকমারিসহ সকল অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে এবং মেলার প্রথমদিন থেকে পাওয়া যাবে অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে।

যোজন যোজন দূর
ধরন: উপন্যাস
লেখক: ফরহাদ হোসেন
প্রকাশনা: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা মাত্র

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *