Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-১)

তিথি কিচেনে এসে ঢুকল। তিতলির চোখে এখনো ঘুম। সে ঘুম চোখেই তার মায়ের পিছে পিছে এসে নাস্তার টেবিলে বসল।
তিথি একটা বাটিতে কিছু দুধ-সিরিয়াল ঢেলে তিতলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে।’ বলেই সে চলে গেল কাপড় বদলাতে।
সকালের নাস্তায় প্রায় প্রতিদিনই তিতলি দুধ-সিরিয়াল খায়। এতে সময় সাশ্রয় হয়। কিন্তু তারপরেও তাকে তাড়াহুড়ো করতে হয়। তিতলি তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে বাটি থেকে দুধ ফেলে দিল। গলার কাছে জামার খানিকটা ভিজে গেল। তিতলি লক্ষ্য করেছে, আম্মু যখনই বলে তাড়াতাড়ি করো, তখনই সে একটা ঝামেলা বাধিয়ে ফেলে। সে একটা পেপার টাওয়েল দিয়ে ভেজা অংশটুকু মুছে নিয়ে যেই এক চামচ সিরিয়াল মুখে নিয়েছে, ঠিক তখনই সে শুনল তার আম্মু তাকে ডাকছে।
দরজার কাছ থেকে তিথি আবার ডাকল, ‘তিতলি, তাড়াতাড়ি করো। নয়তো ক্লাসে দেরী হয়ে যাবে। ডোন’ট বি টার্ডি। আমি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছি।’ বলেই সে বের হয়ে গেল।
স্কুলের দিনে তিতলি কখনোই সকালে খাওয়া শেষ করতে পারে না। প্রায়ই তাকে খাওয়া শেষ না করেই উঠে যেতে হয়। আজও সে তাই করল। সে বাকী সিরিয়ালটুকু ট্র্যাস বিনে ফেলে দিয়ে বেসিনে বাটিটা রেখে দিল। তারপর কাঁধে ব্যাক-প্যাকটা ঝুলিয়ে বাইরে এসে দেখল তিথি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে আছে। সে গাড়িতে উঠে বসতেই তিথি দ্রুত রওয়ানা হয়ে গেল স্কুলের দিকে।
হাসান তার বাসার কম্পিউটার ডেস্কে বসে অফিসের কাজ করছিল। সে সকালে এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে বসেছে। সকাল ন’টায় একটা কনফারেন্স কল ছিল ক্লায়েন্টের সংগে। ৩০ মিনিটের একটা রুটিন কল। প্রতিদিন সকালে ক্লায়েন্টকে আগের দিনের আপডেট দিতে হয়। তারপর সারাদিনে আরো বেশ কয়েকবার কনফারেন্স কল থাকে–কখনো টিমের সংগে আবার কখনো সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সাথে। ব্যস্ততার জন্যে সকালে তার ঐ এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি। হাসান মিটিং শেষ করে কিচেনে গেল কিছু একটা খাবার খাবে বলে। সে ফ্রিজ খুলে দেখল, কিন্তু খাবার মত কিছু খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত মনে ফোন করল তিথিকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘কি করছ?’
‘কি করছি মানে? কাজ করছি। অফিসে এসে মানুষ কি করে?’ তিথি ভ্রূ কুঁচকে উত্তর দিল।
হাসান হেসে ফেলল।
তিথি কাজ করে একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে। তার টেবিলের সামনে একজন ক্লায়েন্ট বসে রয়েছে। একটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের টিকেট রিজার্ভেশনের জন্যে ক্লায়েন্টের ইনফরমেশন এন্ট্রি করছিল সে। এর মধ্যে হাসানের ফোন। তিথি ক্লায়েন্টের দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। ক্লায়েন্ট বসে আছে সামনে।’
‘এই ইয়ে, তিথি, বাসায় তো কোন রান্না নেই। দুপুরে খাবো কি?’
‘আমি কাজ থেকে এসে রান্না করবো। আপাতত কিছু একটা খেয়ে নাও।’
‘কিন্তু সেই কিছু একটা কি? ফ্রিজে তো কিছু নেই।’
‘নেই তো আমি কি করবো? ডীপ ফ্রিজে প্যাকেট ফুড আছে কিনা দেখো। নাহলে কিছু একটা রান্না করে নাও।’
‘রান্না? আমি কখন করবো?’
‘আশ্চর্য হাসান, সব কিছু আমাকে বলে দিতে হবে? রান্না করতে না চাইলে বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসো।’
‘ঠিক আছে, রাখি তাহলে।’
‘ওকে, বাই।’ তিথি ফোন রেখে দিয়ে সামনে বসা ক্লায়েন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি ফর দ্য ইন্টারাপশন!’
‘ইট’স অলরাইট।’
তিথি কম্পিউটার স্ক্রিনে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফ্লাইট আইটিনেরারি প্রিন্ট করে আনল। তারপর ভাঁজ করে একটা এজেন্সির খামে ভরে ক্লায়েন্টের হাতে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর অল সেট মিঃ ম্যাথিউ। ইফ ইউ হ্যাভ এনি কোয়েশ্চেন অর নিড টু মেক এনি চেঞ্জ, প্লিজ কল মি।’
‘আই সিউর উইল। থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘মাই প্লেজার।’
ক্লায়েন্টকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে তিথি ফোন করল হাসানকে।
হাসান ফোন ধরতেই তিথি বলল, ‘এক কাজ করো, ডীপ ফ্রিজে গত সপ্তাহের রান্না করা মাংস আছে। ওটা গরম করে খেয়ে নাও।’
‘অসুবিধা নেই। ফ্রিজে টার্কি স্লাইস আছে দেখলাম। একটা স্যান্ডুইচ বানিয়ে খেয়ে নেবো। তুমি ভেবো না।’
‘দ্যাটস গুড। আমি রাখি তাহলে। আর শোন, তুমি তো একবার কাজে ডুব দিলে জাগতিক সবকিছু ভুলে যাও। তিতলিকে আনতে ভুলে যেও না আবার।’
‘না, না ভুলবো না। এমন ভাবে বলছো যেন আমি প্রায়ই তিতলিকে আনতে ভুলে যাই।’
‘ভুলে যেতে, যদি প্রতিদিন আমি তোমাকে রিমাইন্ড না করাতাম। তোমাকে তো আমি চিনি! তোমার আর কোন কনফারেন্স কল নেই তো আজ, নাকি আছে?’
‘একটা কল আছে দু’টার সময়। কলটা শেষ করেই আমি তিতলিকে আনতে চলে যাবো। তুমি ভেবো না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি তাহলে। বাই।’

পরের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *