রাত প্রায় বারোটা। কিন্তু মীরার চোখে কোনো ঘুম নেই। বারোটা এমন কোনো রাত নয়—তবুও তার টেনশন বেড়ে গেল। এখুনি না ঘুমলে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যাবে। কাল সকালেই একটা জরুরি মিটিং আছে তার।
ইদানীং মীরার ঘুমের সমস্যা হয়েছে। বেশ বড় রকমের সমস্যা। বিশেষ করে যেদিন কাজে বেশি চাপ থাকে কিংবা কোনো কারণে শরীরে অতিরিক্ত ক্লান্তি আসে, সেদিন রাতে সহজে তার ঘুম আসে না। অথচ হওয়া উচিত উল্টো। মানুষ ক্লান্ত কিংবা অবসাদ হলেই বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে।
আজ কাজে অনেক চাপ ছিল মীরার। কাল সকালে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে কোম্পানির ফাইন্যান্স ডিরেক্টর আর কয়েকজন সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। আমেরিকার একটা স্বনামধন্য ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানিতে প্রজেক্ট কন্সাল্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে মীরা। ডালাস ডাউন-টাউনের ৫০ তলার বহুতল ভবন থ্যাঙ্কসগিভিং টাওয়ারের ৩৩ তলায় তার অফিস। যে কোনো ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির একজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্ব অনেক। কাজটাও বেশ জটিল। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হয়। হিসেবের একটু গড়মিল হলেই পত্রপাঠ বিদায়। কিন্তু মাঝে মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন সে কাঁচের জানালা দিয়ে ডালাস ডাউন-টাউনের উঁচু নিচু অট্টালিকার বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাল মীরার ক্যারিয়ারের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এক দশমিক তিন মিলিয়ন ডলারের একটি প্রজেক্ট প্ল্যান তাকে প্রেজেন্ট করতে হবে—ডিরেক্টরদের সামনে। প্রতিটা খাতে কোথায় কী খরচ হবে—তার চুলচেরা হিসেব এবং বিশ্লেষণ দেখাতে হবে—কোনো রকম ফাঁক থাকা চলবে না। তার প্রেজেন্টেশনের উপরেই নির্ভর করছে প্রজেক্টটা অ্যাপ্রুভ হবে কি না। তাই অতিরিক্ত সময় তাকে কাজ করতে হলো আজকে। লাইন বাই লাইন আইটেমসহ স্প্রেডশিট আর পাওয়ার-পয়েন্ট স্লাইড তৈরি করে তার সাথে নোটগুলো মিলিয়ে নিয়ে অফিস থেকে যখন সে বের হয়ে এলো তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা। মীরার খুব ইচ্ছে ছিল পুরো প্রেজেন্টেশনটা একবার রিহার্সাল দেবে, যাতে সময়টাও মিলিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত শরীর বাধ সাধল। মাথাটাও আর কাজ করছে না। সারাদিনে এতো ধকল গেছে যে শেষের দিকে এসে একেবারে মাথাটা ধরে গেল। সারাদিনে তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি। শুধু ভেন্ডিং মেশিন থেকে ব্ল্যাক কফি খেয়েছে কয়েকবার।
এর মধ্যে মীরার বস কাজের অগ্রগতি আর প্রস্তুতি কেমন জানার জন্য কয়েকবার এসে ঘুরে গেছেন। বসের এমন ঘন ঘন খোঁজ নেয়াটা মীরার পছন্দ নয়। মীরাই বা কী করবে? কোনো এক বিচিত্র কারণে অফিসের সবাই তাকে খুবই পছন্দ করে। মীরার সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা তার আশেপাশের সবাইকেই আকর্ষণ করে আর তাইতো অফিসের বিগ বস থেকে শুরু করে সিনিয়র-জুনিয়র কলিগ পর্যন্ত সবাই সুযোগ পেলেই কারণে-অকারণে তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করে। আলাপ করার চেষ্টা করে। অপরদিকে মীরা খুবই স্বল্পভাষী একটি মেয়ে। অকারণে কথা বলা তার একেবারেই অপছন্দ। তবুও মাঝে মাঝে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে কথা বলতে এবং শুনতে হয়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কথা আর কাজের চাপে বিকেল থেকেই মাথাটা ধরে আসছিল মীরার। শেষ পর্যন্ত মাথা ধরা নিয়েই বাসায় ফিরল সে। অফিস থেকে মাত্র বিশ মিনিট দূরেই আপ-টাউনে একটা এপার্টমেন্টে একাই থাকে সে। বিকেলের দিকে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তার খিদেটা কেমন মিইয়ে গেল। একবার ফ্রিজ খুলে দেখল খাবার কী আছে। কিন্তু একনজর দেখেই ফ্রিজ বন্ধ করে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর কাপড় ছেড়ে শাওয়ারে ঢুকে পড়ল মীরা। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল। শরীর থেকে অবসাদের ছায়া একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। গোসল সেরে বের হবার সাথে সাথেই প্রচণ্ড খিদে পেল তার। রাতে এমনিতেই সে তেমন কিছু খায় না। পিনাট বাটার আর স্ট্রবেরি জ্যাম দিয়ে এক স্লাইস মাল্টি-গ্রেইন ব্রেড আর এক কাপ গ্রিন-টি বানিয়ে লিভিং রুমে এসে বসল মীরা। টিভি ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাওয়া শেষ করল। চায়ে শেষ চুমুক দিতেই তার মনে পড়ল সকালে প্রেজেন্টেশনের কথা। সাথে সাথেই মীরার টেনশন বেড়ে গেল। আর দেরি না করে সে ছুটে গেল বিছানায়।
প্রায় এক ঘণ্টা হলো মীরা বিছানায় এসেছে কিন্তু তার দু চোখের পাতা এক হচ্ছে না। ঘুমানোর চেষ্টা যত করছে, চোখ যেন তত খুলে খুলে যাচ্ছে। তবুও সে এক প্রকার জোর করেই চোখ বন্ধ করে রাখল এবং চোখের পাতা চেপে ঘুমানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। উল্টো চোখে কেমন একটা চাপের সৃষ্টি হলো। এমন কেন হচ্ছে সে ঠিক বুঝতে পারছে না। ভালো যন্ত্রণা।
মীরা হাত বাড়িয়ে সেলফোনে সময় দেখল। রাত বারোটা বেজে ষোল মিনিট। আরো কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সে উঠে বসল বিছানায়।
টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে উঠে চলে গেল বাথরুমে। বেসিনে ঠাণ্ডা পানি ছেড়ে দিয়ে বেশ কয়েকবার চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিল। শীতল পানির স্পর্শে মাথার দপদপানিটা একটু কমল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে একবার তাকাল আয়নার দিকে। অমনি ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। রক্ত সরে গেল তার মুখ থেকে। সমস্ত শরীর যেন জমে পাথরের মতো আড়ষ্ট ও ভারী হয়ে গেল। মূর্তির মতো ক্ষণকাল একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। আতঙ্কে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবার অবস্থা হলো। আতঙ্কের প্রধান কারণ—সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, আয়নার ভেতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে একজন সুদর্শন যুবক।
আয়নার ভেতর মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে। তার মুখে স্বভাবসুলভ দুষ্টুমির হাসি। এই হাসি মীরার পরিচিত। ভীষণ পরিচিত। মীরা তীক্ষ্ণ চোখে আবার তাকাল আয়নার দিকে। যুবকের পুরো শরীরটাই দেখা যাচ্ছে। পরনে নীল জিন্স, তার উপরে ফুল হাতা সাদা টি-শার্ট। মাথায় নীল রঙের বেসবল হ্যাট, চোখে নীল ফ্রেমের চশমা। পায়েও নীল রঙের জুতা।
নীল আবীরেরও খুব প্রিয় রঙ ছিল। আর রঙ মিলিয়ে কাপড় পরাটা ছিল তার শখ। ক্লোজেটের দেয়ালে কম করে হলেও বিভিন্ন রঙের গোটা পঞ্চাশেক হ্যাট ঝুলানো থাকত তার। বিভিন্ন রঙের ফ্রেমের চশমা ছিল কম করে হলেও গোটা বিশেক। আবীরের পরনে সেদিন ঠিক এই পোশাকটাই ছিল।
‘মীরা, এত টেনশন করছো কেন? কাল সকালে তোমার প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন ভালো হবে—আমি বলছি। এখন যাও ঘুমিয়ে পড়।’
কে কথা বলল? আবীর? হ্যাঁ, আবীরই তো। অবিকল তার কণ্ঠ। কোনো কারণে মীরার টেনশন হলেই আবীর ঠিক এভাবেই কথা বলত—সাহস দিত।
মীরা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। তীব্র একটা ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। থরথর করে তার হাত পা কাঁপছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এখুনি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। তার এমন লাগছে কেন? মীরা বেসিনের কাউন্টার ধরে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করল।
তুমি জানো না, তুমি টেনশন করলে আমার ভালো লাগে না? কাজে তো চ্যালেঞ্জ থাকবেই—তাই বলে এত বিচলিত হলে চলবে? মনে সাহস রাখো—ইউ উইল বি জাস্ট ফাইন!’
মীরা চোখ তুলে তাকাল আয়নার দিকে—তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। নীল রঙের মানুষটি সাহস দেয়া ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে স্মিত হাসি।
মীরা আবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। নীল রঙের মানুষটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। এসবের মানে কী? মীরার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? পাগল টাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? এসব কীসের লক্ষণ? অতিরিক্ত কাজের চাপে মনে হয় মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে—ঠিকমতো মাথা কাজ করছে না। বিছানায় ফিরে যাবার শক্তি পর্যন্ত নেই। মীরা দাঁড়িয়ে রইল আরো কিছুক্ষণ। একটু স্বাভাবিক হয়ে ফিরে এলো বিছানায়। বসে রইল খাটের কিনারে। বেডসাইড টেবিলে রাখা বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেল। কোথাও কোনো শব্দ নেই। সুনসান নীরবতায় চারিদিকে ছেয়ে আছে।
মীরা হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের পেশি দুর্বল হয়ে এলো তার এবং ঘুম জড়িয়ে এলো চোখে। আর ঠিক তখনই আচমকা একটি হাত এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। হাতটি একটি পুরুষের হাত।
মীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে পড়ে রইল। তার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিল। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে একটু একটু চাপ অনুভব করছে। তাকে খুব অন্তরঙ্গভাবে কাছে টেনে নিতে চাইছে কেউ। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। মানুষটির গায়ের গন্ধও পাচ্ছে সে—গন্ধটা তার পরিচিত। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব?
মীরা এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অন করে তাকাল বিছানার দিকে। তার বিছানায় কেউ নেই। পুরো বিছানা ফাঁকা। সে ঘরের সবগুলো বাতি জ্বালিয়ে দিলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল ভালোমতো—কেউ নেই। তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরল কে? কাছে টেনে নিতে চাইল মানুষটা কে? তার শরীরের গন্ধ এলো কোত্থেকে? এসব কী? মীরার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল।
ভালোবাসার ছায়সঙ্গী (পর্ব-১)
with
no comment

