Ki-Ghotechilo-Las-Vegase

কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-১)

শাহেদের মেজাজ অত্যন্ত খারাপ।
সকাল ১০টা থেকে শায়লা কে সে ফোন করছে, টেক্সট পাঠাচ্ছে অথচ শায়লা কোন উত্তর দিচ্ছে না। এখন বিকেল ৪টা। কোন সমস্যা হলো কি না বুঝতে পারছে না। শায়লার স্বভাব রাতের বেলা ফোনের রিং-টোন মিউট করে দেয়া, কিন্তু সকাল বেলা ফোনটা আনমিঊট করতে ভুলে যায়। আজকেও হয়তো তাই ঘটেছে। কিন্তু শাহেদ বুঝতে পারে না, একটা মানুষ সারাদিনে একবারের জন্যেও ফোন না চেক করে কী করে থাকতে পারে? ফোনটা একবার হাতে নিলেই তো শায়লা দেখতে পেতো শাহেদের মিসকল এবং মেসেজ।
শায়লার ফোন না ধরার সমস্যা আছে। এই বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার শাহেদের ঝগড়া হয়েছে শায়লার সাথে। একবার ব্যবসায়িক খুবই দরকারি একটা কাগজ বাসায় ফেলে কাজে চলে যায় শাহেদ। কাজ থেকে কল করে শায়লাকে, কিন্তু শায়লা ফোন ধরে না। এক বার, দু বার, তিন বার এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে আরো বেশ কয়েকবার ফোন এবং টেক্সট পাঠায় শাহেদ। শায়লার কোন উত্তর না পেয়ে অগত্যা সে বাসায় এসে দেখে শায়লা দিব্যি রান্না ঘরে রান্নায় ব্যস্ত এবং কিচেন কাউন্টারের উপরে তার ফোন।
শাহেদকে দেখে শায়লা কিঞ্চিত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে? তোমার না কী জরুরি মিটিং আছে?’
‘তুমি ফোনটা ধরলে তো আমাকে এভাবে ফিরে আসতে হতো না।’
‘তুমি ফোন করেছিলে নাকি? কই আমি শুনতে পাই নি তো!’
শাহেদ কিচেন কাউন্টার থেকে শায়লার ফোন নিয়ে দেখে, যা সন্দেহ করেছিল তাই। ফোনের রিং-টোন অফ করা। শাহেদের মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। সে ফোনটা শায়লার হাতে দিয়ে বলল, ‘নিজেই দেখ।’
শাহেদ রাগে গজ গজ করতে করতে ওর দরকারি কাগজটা নিয়ে কাজে ফিরে যায়। আজকেও নিশ্চয়ই এমন ঘটনাই ঘটেছে।
শাহেদ বাসায় ফিরে দেখে শায়লা বাসায় নেই।
শাহেদ-শায়লার দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ের নাম অর্পা, বয়স ১৩ বছর আর ছেলে অর্ক, বয়স ১০। শাহেদ দেখল দু ভাই-বোন যার যার রুমে ঘুমাচ্ছে। ভোর ৬টায় ওদেরকে ঘুম থেকে উঠতে হয় স্কুলের বাস ধরার জন্যে। তাই স্কুল থেকে ফিরেই কিছু একটা খেয়ে দু জনেই ঘুমাতে চলে যায়। সন্ধ্যা অবধি ঘুমিয়ে হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে, চলে মধ্যরাত অবধি। শাহেদের খুব মায়া লাগল তারপরেও সে অর্পাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ ইউর মামি।’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই অর্পা উত্তর দিল, ‘আই ডোন্ট নো।’
‘স্কুল থেকে ফিরে মামিকে বাসায় দেখনি?’
‘নো।’
‘কোথায় গেছে কিছু জানো?’
‘আই হ্যাভ নো আইডিয়া।’ বলেই অর্পা পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে অর্পার রুম থেকে বেড় হয়ে এলো।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি ব্যস্ততম শহর ডালাস। আমেরিকার অন্যান্য বড় শহর গুলোর মত এখানেও রয়েছে কয়েক সহস্র বাঙ্গালীর বসবাস। জীবিকা নির্বাহের জন্যে বিভিন্ন ধরনের পেশার পাশাপাশি সফল ভাবে ব্যবসাও করছেন অনেকে। তাদেরই একজন আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র শাহেদ।
শাহেদ বৃহত্তর ডালাসের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কমিউনিটিতেও বেশ পরিচিত। অল্পতে রেগে গেলেও একজন বড় হৃদয়ের মানুষ হিসেবে অনেক সুনাম রয়েছে তার।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেল। ডালাসের হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে শাহেদের গাড়ি। প্রায় ত্রিশ মিনিট ড্রাইভিং শেষে শাহেদের গাড়ি এসে থামল উপশহরের একটি বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েতে। পার্ক করেই দ্রুত বের হয়ে বড়ির সম্মুখ দরজায় এসে দাঁড়াল শাহেদ। অস্থিরভাবে কয়েকবার ডোর বেলে চাপ দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবারো ডোর বেলে চাপ দিলো শাহেদ। তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। সিদ্ধান্ত নিল, এবার চাপ দিয়ে দাড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ দরজা না খুলে। শাহেদ ডোর বেলের দিকে হাত বাড়াতেই দরজা খুলে গেল।
খোলা দরজার অপর প্রান্তে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে সে এক কথায় সুশ্রী এবং আকর্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যে এমন মেয়েকেই বোধ হয় বলে সুন্দরীতমা। সুন্দরীতমার নাম নায়লা। নায়লার সবচেয়ে বড় গুন, যে কোন পরিস্থিতিতেই সে আনন্দে থাকে। তার আনন্দ সীমাহীন। তার অভিধানে দুঃখবোধ বলে কিছু নেই।
শাহেদকে দেখে একটু অবাক হবার ভান করল নায়লা, ‘দুলাভাই, আপনি?’
নায়লার হাসি হাসি মুখের দিকে ভুরু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরক্ত মুখেই জানতে চাইল শাহেদ, ‘দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? থাকো কোথায়?’
‘সরি দুলাভাই, কিচেনে ছিলাম। ডিশ ক্লিন করছিলাম তো, তাই শুনতে পাইনি।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। তোমার আপুকে ডাকো।’
‘আপুকে ডাকবো মানে?’
‘কেন শায়লা আসেনি এখানে?’
‘না তো। কেন, শায়লা’পুর আসার কথা ছিল নাকি এখানে?’ নায়লা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘আসার কথা থাকবে কেন? কিছু হলেই তো সে তোমার এখানে চলে আসে। এই হয়েছে আরেক যন্ত্রণা।’
‘আবার কী হয়েছে?’
‘হবে আবার কী? কিছুই হয়নি।’
‘আসুন ভেতরে আসুন। ভেতরে এসে কথা বলুন।’
‘আরে সকাল থেকে ফোন করছি। বাসার ফোনও ধরছে না, সেল ফোনও ধরছে না। টেক্সট পাঠালাম, নো রেসপন্স। মেসেজ রাখলাম, কোন খবর নেই। এসবের মানে কি?’
‘দুলাভাই, আপনি কি এখানে দাড়িয়েই কথা বলবেন, নাকি ভেতরে আসবেন?’
‘ভেতরে এসে কী হবে?’ বলেই শাহেদ দরজা ঠেলে, নায়লাকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। নায়লা চোখ ঘুড়িয়ে দরজা বন্ধ করে শাহেদের পিছে পিছে বসার ঘরে এলো।
‘দুলাভাই, আপনি একটু বসুন, আমি আপনার জন্যে কফি নিয়ে আসি।’
‘না না, কফি আনতে হবে না। মেজাজ এমনিতেই অনেক গরম। এর মধ্যে আর গরম কিছু খেতে চাই না। তুমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসো।’
নায়লা মুচকি হেসে রান্না ঘরে চলে গেল আর তখনই কাজ থেকে ফিরে ঘরে ঢুকলো নায়লার স্বামী নাভিদ। বসার ঘরে শাহেদকে দেখে এগিয়ে গেল।
‘আরে শাহেদ ভাই, কেমন আছেন, সব খবর ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সব খবর ভাল।’
‘শায়লা আপা কেমন আছে? বাচ্চারা সবাই ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সবাই ভাল।’
‘একাই এসেছেন, ওরা কেউ আসেনি?’
‘না। একাই এসেছি।’
‘ইজ এভ্রিথিং অল-রাইট শাহেদ ভাই?’
‘কী যন্ত্রণা, তুমিতো দেখি মনের সুখে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছ? কেন, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে সামথিং ইজ রং?’ শাহেদ বিরক্তি চোখে তাকাল নাভিদের মুখের দিকে। নাভিদ থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে রইল।
নায়লা বরফ কুচি মিশিয়ে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দিলো শাহেদের হাতে। এক চুমুকে সবটুকু পানি খেয়ে শাহেদ গ্লাসটা নায়লার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা নায়লা, তুমি বলো, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে যে সামথিং ইজ রং?’
নায়লা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কই নাতো!’
এবার শাহেদ আবার তাকাল নাভিদের দিকে। নাভিদ অসহায় চোখে তাকাল নায়লার দিকে। নায়লা বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, টেবিলে খাবার দিচ্ছি, আপনি ভেতরে গিয়ে বসুন। নাভিদ, তুমিও ফ্রেশ হয়ে আসো। চলেন দুলাভাই।’
নায়লা শাহেদকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। নাভিদ ওদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
ডাইনিং টেবিলে হরেক রকমের খাবার সাজানো হয়েছে। শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। নাভিদ এসে যোগ দিয়েছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। সবার মনোযোগ যেন খাবারের দিকেই। নায়লা শাহেদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, রান্না কেমন হয়েছে?’
‘খারাপ না।’ মুখ না তুলেই উত্তর দিলো শাহেদ।
নায়লা বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘খারাপ না মানে কী?’
শাহেদ মুখ তুলে তাকাল নায়লার দিকে, ‘মানে ভালই। আমার শাশুড়ির কাছ থেকে এই একটা জিনিষ তোমরা শিখেছ। তার ভাল কোন গুন তো তোমরা কেউ পাওনি, শুধু এই রান্নাটা ছাড়া।’
নাভিদ বলল, ‘শায়লা আপা এলে ভাল হতো। আড্ডাটা জমতো।’
‘শায়লার খোজেই তো এখানে এলাম। কোথায় যে গেছে কে জানে। কিছুতো বলেও যায়নি। কোন নোট রেখেও যায়নি। সারাদিন চলে গেল, বুঝতে পারছি না।’
‘আপু চলে গেছে। আর ফিরে আসবে না।’ গলার স্বর যথেষ্ট ঠাণ্ডা করে শান্ত ভাবে কথাটা এমন ভাবে বলল নায়লা যেন কিছুই ঘটেনি।
শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল নায়লার দিকে। তারপর তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কী বললে?’
নায়লা সব কিছুই জানে তবুও সে কিছু না বলে চুপ করে রইল।
শাহেদ কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এসবের মানে কী?

পরের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *