Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-১)

গভীর রাতে ফরিদের ঘুম ভেঙে গেল।
অনেকক্ষণ থেকে কে যেন ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে, ‘বাবা। বাবা।’ কণ্ঠটা খুব পরিচিত। ভিকি ভয় পেলে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে এভাবে অনবরত ডাকতে থাকে। ভিকি ফরিদের ছেলে। বয়স পাঁচ বছর দশ মাস।
ফরিদ কান খাড়া করে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কোনো রকম শব্দ শুনতে পেল না আর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। পাশে তাকিয়ে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে মুখ ঢুকিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত অভ্যাস তার—ঘরের উষ্ণতা যাই থাকুক অথবা প্রকৃতিতে যেই ঋতুই চলুক না কেন, তাতে তার কিছু যায় আসে না। মুখ না ঢেকে সে ঘুমবে না। মাথার উপর একটা ফ্যান ঘুরবে সারা বছর। কাঠফাটা গরমেও ফ্যান ঘুরে—কনকনে শীতেও। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্লাঙ্কেটে সারা শরীর মুড়িয়ে ঘুমানো তার অভ্যাস। এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও করা যাবে না। কী যে এক যন্ত্রণা!
ফরিদ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হয় না? নিশ্বাস নাও কীভাবে—দম তো বন্ধ হয়ে যাবার কথা।’
‘কেন আমার দম বন্ধ হয়ে গেলে বুঝি তুমি খুশি হও?’
‘কী মুস্কিল—আমি কি তাই বললাম নাকি?’
‘হয়েছে হয়েছে—মনে মনে তো তাই চাও! তুমি কি ভেবেছ, আমি কিছু বুঝি না?’
‘উফ—তুমি না…’ ফরিদ আর কথা বাড়ায় না। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। ভালো রকম সমস্যা। সহজ ভাবে সে কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফরিদ দুষ্টুমি করে বলে, ‘সুন্দরী মেয়েদের ঘুমলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। এমন সুন্দর মুখখানি ঢেকে রেখে ঘুমলে কেমন হয় বলতো?’
‘আমি সুন্দরী?’
‘অবশ্যই সুন্দরী!’
‘তাহলে তোমাদের বাসার সবাই আমার পেছনে আমাকে পেত্নী বলে কেন—আমি কি ভূত?’
ফরিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিলির মুখের দিকে। সে কী বলবে, কী বলা উচিত, কিছুই বুঝতে পারে না। এটা ঠিক মিলির গায়ের রঙ সেই অর্থে ফর্সা নয়। তাই বলে তাকে কিছুতেই অসুন্দর বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের গড়পড়তা মানুষ—মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে তাকে সুন্দরী বলে গণ্য করে না। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে—তার গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া চাই।
ফরিদের অবশ্য এ ধরনের কোনো প্রেজুডিস নেই—ছিল না কোনো কালেও। তার চোখে মিলি যথেষ্টই সুন্দরী। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও—দেখতে সে অসাধারণ। হরিণের মতো কাটাকাটা চোখ—কী মায়া লেগে আছে সেই চোখে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল—যাকে বলে মেঘ বরন কন্যা। অসম্ভব সুন্দর অবয়ব তার। মেদহীন একহারা, আকর্ষণীয় দেহ কাঠামো। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিলির ব্যক্তিত্ব—যার প্রেমেই ফরিদ ডুবে ছিল আকণ্ঠ। তাই তো পরিবারের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে ফরিদ মিলিকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরিদের পরিবারের কেউই এই বিয়ে মেনে নেয়নি—তা নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথাও নেই। ফরিদের সাফ কথা—গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে, যদি মানুষটার মনটাই ভালো না হয়। মিলি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মানুষ। শুধু স্বভাবটাই একটু পাগলাটে।
‘বাবা। বাবা।’
ফরিদের নিরবচ্ছিন্ন চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল ভিকির কথা। একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে সে উঠে বসল বিছানায়। ছেলেটা যে কেন এত ভয় পায়?
রাত কতটা গভীর কে জানে? ভিকির কথা ভেবে ফরিদের মনটা একটু খারাপই হলো। ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো একা একা থাকছে তার নিজের রুমে। মিলি সুন্দর করে ভিকির বেডরুম সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে নীলের ছড়াছড়ি। বিছানা-কার্পেট-ওয়াল পেপার সব কিছুতেই নীলের ছোঁয়া। রুমের একপাশে ছোটবেলা থেকে জমানো ভিকির সব খেলনা গাড়ি।
এতদিন ভিকি তার মায়ের রুমেই ঘুমতো। মিলির মাস্টার বেডরুমে কিং সাইজ বেডের প্রায় পুরোটা নিয়েই ছিল তার বিচরণ। মিলি খাটের এক কোনায় চুপচাপ পড়ে থাকে। ভিকির জন্মের পর থেকেই মায়ের বিছানাতে ছেলের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফরিদ ঘুমায় অন্য আরেক রুমে। ভিকি পাঁচ বছরে পড়তেই ফরিদ বলে আসছিল মিলিকে—এখন থেকে ভিকিকে ওর নিজের রুমে থাকতে দেয়া উচিত। এখনই অভ্যাস না করলে পরে সমস্যা হয়ে যাবে। ছেলে একা একা ভয় পাবে—একা থাকতে চাইবে না।
‘তোমার মতলবটা কী? ছেলেকে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করতে চাও তুমি?’ ভ্রু কুঁচকে মিলি বলল।
‘কী আশ্চর্য—আমি কী তাই বললাম নাকি?’
‘তো কী বললে?’
‘আমি বললাম…’
‘থাক—আর বোঝাতে হবে না।’ ফরিদকে থামিয়ে দিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা হবে না। রাতে আমার বিছানায় তুমি ঘুমাতে পারবে না—তোমাকে আলাদাই ঘুমাতে হবে।’
‘ফর হাউ লং?’
‘যতদিন না তোমার প্রেশার কুকার হুইসেল বাজানো বন্ধ হয়।’
ফরিদ তাকিয়ে থাকে অসহায় দৃষ্টিতে। এসব কী বলে মিলি?
‘আচ্ছা তোমাকে না কতদিন বলেছি একজন ডাক্তার দেখাও। তোমার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে—কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনবা না। কী আর করা।’
ফরিদ কিছু একটা বলার আগেই মিলি আবার বলল, ‘ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেই তুমি যদি মনে করে থাকো—আমার বিছানায় পার্মানেন্ট জায়গা হবে তোমার, সেটি হবে মস্ত বড় ভুল। সেটি হচ্ছে না।’
‘তাই বলে…’
‘আমি সব কিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারি—কিন্তু আমার ঘুমের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আর সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো ফরিদ।’ ফরিদকে আবার থামিয়ে দিয়ে বলল মিলি।
কাজেই ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেও ফরিদের কপালের কোনো হেরফের হলো না। সে বহাল তবিয়তেই তার রুমেই স্থায়ী এখনো। তবে সপ্তাহে দু’একদিন এর ব্যতিক্রম হয়। ফরিদের ভাগ্যে তখন মিলির বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ হয়। আজকের রাতটাও ছিল তেমনি এক বিশেষ রাত।
ফরিদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিল—অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মিলির টেক্সট মেসেজ এলো—কি ঘুম আসছে না? এসো ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেই। আসার সময় চেক করে এসো ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
ফরিদ খুব ভালো করেই জানে এটা কীসের ইঙ্গিত। সে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মিলির রুমের দিকে ছুটে গেল।
মিলিকে পাতলা নাইটিতে দেবীর মত লাগে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা একেবারেই অসাধ্য। ফরিদ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মিলি বলল, ‘ভিকির রুম চেক করে এসেছ? ও ঘুমিয়েছে তো?’
‘নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে নাকি?’
‘তবু যাও—দেখে আসো।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল মিলি।
এমন পরিস্থিতি কেউ এমন শীতল ব্যবহার করতে পারে ফরিদের জানা ছিল না। তার মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো কিন্তু সে জানে তর্ক করে লাভ নেই—অযথা সময় নষ্ট হবে। ফরিদ কথা না বাড়িয়ে দেখতে গেল ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
মিলির মাস্টার বেডরুম আর ফরিদের রুমের মাঝখানেই ভিকির রুম। সাথে একটা বাথরুম লাগোয়া—যেটা ফরিদ আর ভিকির রুমের ঠিক মাঝে। দু’রুম থেকেই দরজা আছে। দু’পাশ থেকেই ব্যবহার করা যায়। ফরিদ দেখল ভিকি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবুও সে তার বিছানার পাশে গিয়ে একবার দেখল। ভিকির ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে ফরিদ নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেল মিলির ঘরে।
এসে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার নিশ্বাসও ভারি হয়ে এসেছে। মিলি কি ঘুমিয়ে পড়ল—এত তাড়াতাড়ি? ফরিদ কী করবে? চলে যাবে তার রুমে নাকি মিলির ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়বে। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কি এসব করা যায়—হোক না সে তার স্ত্রী। ফরিদ দ্বিধা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ফরিদের মনে পড়ল একদিনের কথা। ভিকিকে ঘুম পাড়িয়ে মিলি ফরিদের রুমে এসে বলল, ‘কী ব্যস্ত?’
ফরিদ একটা জরুরি রিপোর্ট রেডি করছিল—পরদিন সকালে ওর মিটিংর জন্য। সে মাথা তুলে তাকাল।
মিলি বলল, ‘কাজ শেষ করে এসো। আমি জেগে থাকব।’
‘তুমি জেগে থাকবে?’ একটু মৃদু হেসে অবাক কণ্ঠে বলল ফরিদ।
‘হ্যাঁ থাকব।’
‘আচ্ছা যাও আসছি। ফিফটিন মিনিটস।’
হাতের কাজ শেষ না করেই ঠিক বারো মিনিটের মাথায় ফরিদ মিলির ঘরে যেয়ে দেখল—মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে। যথারীতি নিশ্বাস ভারি। মুখটা দেখা গেলেও বোঝা যেত সে ঘুমিয়েছে কিনা, কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই।

পরের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *