ঢাকা শহরের ব্যস্ততম আবাসিক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল শাহেদ। তার হাতে এক টুকরো কাগজ। সেখানে লেখা সাইনবোর্ডের নাম মিলিয়ে সে ভিতরে প্রবেশ করল।
ভিতরে ঢুকে সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সে কারো সংগে দেখা করতে এসেছে। সে আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনের দিকে আর তখনই তার দৃষ্টি থেমে গেল কোনার দিকের একটি টেবিলে বসা যুবকের দিকে। ঝাঁকরা চুল, একহারা লম্বা গড়ন। শাহেদ এগিয়ে কাছে যেতেই ঝাঁকরা চুল মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল তাকে। তারপর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শাহেদ?’
শাহেদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
‘আমি ইমরান। ইমরান হোসেন খান। ঐ যে সেদিন…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।’
‘প্লিজ বসুন।’
শাহেদ বসতেই ইমরান বলল, ‘কী খাবেন বলুন?’
‘না, কিছু খাবো না।’
‘এদের বিফ সমুচাটা খুব ভালো। আমি দুটো খেয়েছি। সাথে এক কাপ চা। খেয়ে দেখুন না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, সমুচা দিতে বলুন।’
ইমরান একজন ওয়েটার ডেকে আরো চারটা সমুচা আর দু’কাপ চা দিতে বলল।
কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে শাহেদ জানতে চাইল, ‘আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?’
ইমরান একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে শাহেদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই ছবিটার পেছনে লেখা ছিল।’
শাহেদ ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল, এটি তারই ছবি এবং ছবির পেছনে ওর পুরা নাম আর ফোন নাম্বারটা লেখা। সে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন কী ব্যাপারে ডেকেছেন?’
‘সোনিয়ার ব্যাপারে…। ওর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি, ওকে কিভাবে চেনেন, কিভাবে পরিচয় হলো, এইসব আর কি…’
শাহেদ বোঝার চেষ্টা করল। কিছু বলল না।
ইমরান আবার বলল, ‘বুঝতে পেরেছি, আপনি হয়তো ভাবছেন এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমাকে কেন বলবেন, এইতো?’
শাহেদ সরাসরি তাকাল ইমরানের মুখের দিকে। তার চেহারায় ইতস্তত ভাবটা স্পষ্ট।
ইমরান মরিয়া হয়ে বলল, ‘আই নিড ইয়োর হেল্প শাহেদ, এন্ড আই অ্যাম প্রিটি শিওর, ইউ নিড মাইন। এখন আমাদের উচিত দুজন দুজনকে সাহায্য করা।’
শাহেদ একবার তাকাল বাইরে, আবার তাকাল ইমরানের দিকে। মনে হচ্ছে সে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। তার চোখের দৃষ্টিতে তাই বলে। শাহেদ নিজেও বুঝতে চায়, ইমরানের সম্পৃক্ততাই বা কী?
ইমরান সমুচার প্লেট সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন খান। খেতে খেতে বলুন।’
শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার ইতস্তত ভাবটা কাটতে কিছুটা সময় লাগছে। সে তার হাতের ফোনটি নিয়ে টেবিলের উপরে ঘুরাতে লাগল।
কিছুদিন আগের কথা। শাহেদ তার রুমে বসে কয়েকদিনের পুরনো একটি নিউজপেপারে বিজ্ঞাপনের পাতা উল্টিয়ে দেখছিল। হঠাৎ করেই তার চোখ আঁটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনের দিকে। মোটা কালিতে হেডলাইনে লেখা, ‘বিয়ে করে বিদেশ যান।’
হেডলাইনের নীচে দু’লাইনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘কানাডায় বসবাসরত (সিটিজেন) কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী পাত্রীর (৩০) জন্যে ভদ্র, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত অনূর্ধ্ব ৩৫ বছরের পাত্র আবশ্যক। পাত্রীর একবার বিয়ে হয়েছিল। শুধুমাত্র নিজ খরচে কানাডায় যেতে ইচ্ছুক পাত্র যোগাযোগ করুন।’
নীচে একটি ফোন নাম্বারও দেয়া আছে। শাহেদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কয়েকবার বিজ্ঞাপনটি পড়ল। তারপর কলম দিয়ে বিজ্ঞাপনটির চারিদিকে একটি বৃত্ত একে চিহ্নিত করে রাখল।
‘ভাইয়া খেতে আসো। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে।’ শাহেদের ছোটো বোন সোমা দরজায় উঁকি দিয়ে বলেই চলে গেল রান্নাঘরে।
রান্নাঘরের দিকে যেতেই দূর থেকে সোমা শুনতে পেল তার বাবার কণ্ঠ, ‘সোমা, মা দেখতো আমার চশমাটা কোথায় রাখলাম? বোধহয় বেডরুমে ফেলে এসেছি।’
‘দেখছি বাবা।’ বলেই সোমা চলে গেল বেডরুমে।
শাহেদ ইতিমধ্যেই খাবার টেবিলে এসে বসেছে। শাহেদ-সোমার বাবা রাকিবউদ্দিন সাহেব শাহেদের দিকে একবার তাকালেন। তারপর ভ্রূ কুঁচকে বিদ্রূপাত্মক স্বরে বললেন, ‘তারপর ইয়াংম্যান, এভাবে আর কতদিন? শো মি সাম ফায়ার!’
শাহেদ চুপ করে রইল। সোমা চশমাটা এনে তার বাবার হাতে দিল। রাকিবউদ্দিন সাহেব চশমা চোখে দিয়ে আবার শাহেদের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া ভঙ্গীতে বললেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, ব্যাংকে যে ইন্টারভিউটা দিয়েছিলে, তার কী খবর? রেজাল্ট পেয়েছ?’
শাহেদ খানিকটা ইতস্তত করে বলল, ‘চাকরীটা আমার হয়নি বাবা।’
‘হবে না জানতাম।’ সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল।
‘হলো না কেন?’ রাকিবউদ্দিন সাহেব জানতে চাইলেন।
‘পরীক্ষা দিয়েছিলাম দু’হাজারের বেশি। নিয়েছে মাত্র পাঁচজন। এদের মধ্যে দুজন দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর রিলেটিভ, একজন ব্যাঙ্কের এক বড় অফিসারকে দিয়েছে তিন লাখ টাকা ঘুষ। এই তিনজন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। বাকী দুজন নিয়েছে মেরিটে।’ শাহেদ থেমে থেমে ব্যাখ্যা দিল।
‘হুম, আজকাল প্রায় সব চাকরীর ক্ষেত্রেই এরকম হচ্ছে। দেশটা যে কোথায় যাচ্ছে!’ রাকিবউদ্দিন সাহেব আফসোসের সুরে বললেন।
‘দেশের তো আর হাত পা নেই যে কোথাও যাবে! আমরাই বদলে যাচ্ছি বাবা!’ সোমা বিজ্ঞের মত বলল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাকিবউদ্দিন সাহেব শাহেদের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘তো এখন কি করবে ভেবেছো কিছু?’
‘ভাবছি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ারে ব্যবসা করবো। অল্প কিছু ক্যাপিটাল হলেই শুরু করা যাবে।’
শাহেদ-সোমার মা জাহানারা বেগম টেবিলে খাবার পরিবেশন করছিলেন। তিনি এতক্ষণ শুনছিলেন বাবা-ছেলে-মেয়ের কথাবার্তা। এবার তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে শাহেদের দিকে তির্যক দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তোকে মাস্টার্স পাশ করিয়েছি কি ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্যে? ব্যবসা করবি তো মেট্রিক পাশ করে করলেই পারতি? মাস্টার্স করার কী দরকার ছিল?’
শাহেদ ইতস্তত করে অন্যদিকে তাকাল। কী বলবে ভেবে পেল না।
সোমা শাহেদের দিকে তাকিয়ে তার মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করল। খাবার টেবিলে সব সময় বাবা আর মায়ের আগ্রাসনের স্বীকার হয় শাহেদ। সব সময় তাই অপরাধীর মতো হয়ে থাকে বেচারা। ভাইয়ের জন্যে তার অনেক খারাপ লাগে কিন্তু সে-ই বা কী করবে। সোমা মায়ের কথায় বিরক্ত প্রকাশ করল। শাহেদের পক্ষ নিয়ে সে বলল, ‘এটা কেমন কথা বললে মা? মাস্টার্স করেছে বলে ভাইয়া বিজনেস করতে পারবে না? কী সব সিলি চিন্তা ভাবনা!’
জাহানারা আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমাদের কত শখ ছিল তুই একটা বড় চাকরী করবি।’
‘চাকরী না পেলে কী করবো মা? কিছু একটা তো করতে হবে?’ শাহেদের কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।
‘সেই কিছু একটা কী মাই সান?’ রাকিবউদ্দিন প্রশ্ন করে তাকিয়ে রইলেন শাহেদের মুখের দিকে।
শাহেদ অবশ্য কোনো উত্তর দিতে পারল না। খাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল।
শাহেদ তার ঘরে এসে মন খারাপ করে বসে রইল। প্রতিদিন খাবার টেবিলে এই একই বিষয়ে কথা বলতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু ঘুরে ফিরে এই একটি বিষয়েই তাকে কথা বলতে হয়। ‘ইন্টারভিউর কী হলো’, ‘এভাবে আর কতদিন’, ‘শো মি সাম ফায়ার ইয়াংম্যান’ এই জাতীয় প্রশ্নে সে যথেষ্ট বিব্রত হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই।
শাহেদ পুরনো পত্রিকাটি কী মনে করে হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে থাকল এবং তার চোখে পড়ল সেই বিজ্ঞাপনটি, যেটিতে সে বৃত্ত একে চিহ্নিত করে রেখেছিল। সে বিড়বিড় করে আবার পড়ল।
-: বিয়ে করে বিদেশ যান :-
‘কানাডায় বসবাসরত (সিটিজেন) কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী পাত্রীর (৩০) জন্যে ভদ্র, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত অনূর্ধ্ব ৩৫ বছরের পাত্র আবশ্যক। পাত্রীর একবার বিয়ে হয়েছিল। শুধুমাত্র নিজ খরচে কানাডায় যেতে ইচ্ছুক পাত্র যোগাযোগ করুন।’
বিজ্ঞাপনটি পড়তে পড়তেই শাহেদের চোখ মুখে একধরণের উজ্জ্বলতার আভা দেখা দিল। সে মনস্থির করে ফেলল যে সে বিষয়টি কী যাচাই করে দেখবে। শাহেদ ফোন নাম্বারটি দেখে একটি একটি করে নাম্বার টিপে ফোনটি কানে নিয়ে উত্তেজিত ভাবে অপেক্ষা করতে থাকল।
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১)
with
no comment

