নাম তার বাতাসের শহর। স্থানীয়রা বলে উইন্ডি সিটি। শহরটির নাম—শিকাগো।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটি সৌম্য আর আভিজাত্যের মিশেলে একটি অন্যতম শহর। শিল্প সাহিত্যে অনন্য। ব্লুজ এবং জ্যাজ মিউজিকের জন্যে বিখ্যাত। এককথায় মাল্টি-কালচারাল মেট্রোপলিটন সিটি বলতে যা বোঝায়—শিকাগো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
লেক মিশিগানের তীরে গড়ে উঠা শিকাগোর ডাউন-টাউন দেখে অনায়াসে এর নাম দেয়া যায় অট্টালিকার শহর। এখানে অগণিত সারি সারি সুউচ্চ ভবন কিন্তু কনক্রিটের জঞ্জাল বলা যাবে না মোটেও। দেখবার মত সুন্দর, চোখ ধাঁধানো সব উঁচু স্থাপনাগুলো একটার পর একটা যেন পাল্লা দিয়ে ঘোষণা করছে নিজেদের আধিপত্যের কথা। হঠাৎ করে মনে হয়, শহরে যেন উঁচু ভবনগুলোর বাহারী মেলা বসেছে।
এই শহরে দু’টি এয়ারপোর্ট। ও’হেয়ার এবং মিডওয়ে—দুটোই ইন্টারন্যাশনাল। এর মধ্যে ও’হেয়ার পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যস্ততম। এই ব্যস্ততম এয়ারপোর্টে কোনো এক সকালে বাংলাদেশ থেকে একটি মেয়ে এসে পৌঁছল—আমাদের গল্পের ঘটনা এই মেয়েটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
মেয়েটি প্লেন থেকে বের হয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল শিকাগো ও’হেয়ার এয়ারপোর্টের চাকচিক্য—চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মত। কী এলাহি ব্যাপার! এয়ারপোর্টের মত একটা ব্যাপার এত বিশাল হতে পারে—সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
মেয়েটি চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—আঁতিপাঁতি করে খুঁজল একটি মুখ। প্লেন থেকে বের হয়েই যে মুখটি দেখবে বলে সে ধারণা করেছিল তার দেখা মিলল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে তার ভারী লাগেজ দুটো নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। আবার তাকালো চারিদিকে—নাহ, সে কোথাও নেই। মেয়েটি এখন কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
ব্যাগেজসহ এয়ারপোর্টের সামনের রাস্তায় নেমে এলো মেয়েটি—যে স্থানে সাধারণত বহির্গামী যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয়। প্রচণ্ড বাতাস আর কনকনে শীত। মুহূর্তের মধ্যেই শরীর হিম হয়ে গেল তার। দাঁতে দাঁত লেগে ঠক ঠক আওয়াজ হতে লাগল। একটা প্রিন্টের সালওয়ার-কামিজ, উপরে নীল রঙের একটা হাল্কা জ্যাকেট শুধু। এতে শিকাগোর শীত মানার প্রশ্নই উঠে না। শিকাগোর শীত মানে ভয়াবহ ব্যাপার। শীত সহ্য করতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে সে পুনরায় টার্মিনালের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর স্বচ্ছ কাঁচের মধ্যে দিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাইরে।
সকাল ন’টায় প্লেন ল্যান্ড করেছে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করতে লেগেছে প্রায় দেড় ঘণ্টার মত। এরপর কেটে গেছে আরো ত্রিশ মিনিট। এখন বাজে সকাল এগারোটার মতো। মানুষটা এখনো এলো না আর কেনই বা আসছে না তার কিছুই সে বুঝতে পারছে না। মেয়েটি দুশ্চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়ল। একে তো এত দীর্ঘ ফ্লাইট আর এখন প্রায় তিরিশ ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে যার কাছে এলো—তারই দেখা নেই। সে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে আর ক্ষণে ক্ষণে বাইরে তাকাচ্ছে।
এভাবে বসে থেকেই বা কী লাভ। বেশ কিছুক্ষণ পর সে সাহস করে আবার বের হয়ে এলো। অন্তত কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করলে কিছু নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাবে। স্যুট-টাই পড়া একজন সাদা আমেরিকান ভদ্রলোককে দেখে মেয়েটি এগিয়ে গেল। ‘এক্সকিউজ মি।’ ভদ্রলোক দাঁড়াতেই মেয়েটি থেমে থেমে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘আই এম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই নিড হেল্প…’
মেয়েটি কথা শেষ করার আগেই ভদ্রলোক হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সরি, আই’ভ টু ক্যাচ মাই ফ্লাইট। আই’ম রানিং লেট।’ বলেই দ্রুত পাশ কাঁটিয়ে চলে গেলেন তিনি।
‘আই নিড হেল্প। প্লীজ হেল্প মি!’ মেয়েটি আবারো বলল।
ভদ্রলোক একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটিকে তারপর যেভাবে হাঁটছিলেন সেভাবেই দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন।
মেয়েটি মন খারাপ করে চারিদিকে তাকালো। এই বুঝি সে আসে। কিন্তু না—সে এলো না।
একজন লম্বা মত যুবককে দেখে মেয়েটি তার দিকে হেঁটে গেল। তারপর একই ভঙ্গীতে বলল, ‘আই এম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই এম লস্ট। আই নিড হেল্প…’
মেয়েটিকে দূর থেকে দেখে লম্বা যুবক সম্ভবত আগেই বুঝতে পেরেছিল কিছু। ‘সরি ক্যান্ট হেল্প… রানিং লেট… গটা গো।’ বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল লম্বা যুবকটি।
এরপর মেয়েটি আরো কয়েকজনকে একইভাবে জিজ্ঞেস করল কিন্তু কেউ তাকে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারল না। একজন শুধু আগ্রহ নিয়ে তার কথাগুলো শুনল তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট ইউ আর সেয়িং… ক্যান ইউ রিপিট দ্যাট?’
মেয়েটি আবার বলল। লোকটি আবারো মাথা ঝাঁকাল—সে বুঝতে পারছে না। এক পর্যায়ে খানিকটা হতাশ হয়েই সে চলে গেল।
তার কথা কি তাহলে কেউ বুঝতে পারছে না? মেয়েটি অত্যধিক হতাশ হয়ে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটির বড় বোনের কথা মনে পড়ল। ঢাকা এয়ারপোর্টে তার বোন তাকে বিজ্ঞের মত বলেছিল, ‘শোন, একেবারেই ভয় পাবি না। আমেরিকায় ভয়ের কোনো ব্যাপারই নাই। সবাই খুব হেল্পফুল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই তোর হাত ধরে সে কাজটি করে দিবে। শুধু বলবি—হেল্প মি প্লীজ। ব্যস, দেখবি মন্ত্রের মত কাজ হয়ে গেছে। একবার কি হয়েছে শোন—শহীদ যেবার প্রথম আমেরিকায় গেল তখন সে কিছুই চিনত না। তো সোশ্যাল সিকিউরিটি অফিসে যাবার জন্যে সাবওয়ে ট্রেন থেকে নেমে দিকহারা হয়ে পড়ে। তখন এক থুত্থুড়ি বুড়ি ওর হাত ধরে অফিস পর্যন্ত পৌঁছে দিল। অনেক কথাও বলল। নতুন আসছে বলে অনেক উপদেশ দিল। জিজ্ঞেস করল, দেশ কোথায়? শহীদ বলল, বাংলাদেশ। বুড়ি বলল, ওয়াও বাংলাদেশ? এমন ভাবে বলল যেন বাংলাদেশ তার শ্বশুর বাড়ি। বুঝলি কিছু?’
আপা এমনভাবে কথা গুলো বলছিল যেন আমেরিকার সবকিছু তার নখদর্পণে। ভাবটা এমন যেন কতবার আমেরিকা সে ঘুরে গেছে। অথচ তার ভ্রমণ ঐ ফরিদপুর—ঢাকা—ফরিদপুর পর্যন্তই। মেয়েটির বাড়ি ফরিদপুর শহরে—সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। পড়াশুনাও সেখানেই।
আমেরিকার মানুষজনকে যতটা বন্ধু ভাবাপন্ন আর সাহায্যকারী মনে করেছিল মেয়েটি—ধীরে ধীরে তার সেই ধারণা পাল্টে গেল। সত্যি কথা হলো, এখানে সবাই ব্যস্ত—সবাই ছুটছে। হাজার হাজার মানুষ। অথচ একদণ্ড দাঁড়াবার সময় যেন কারুরই নেই।
এই পর্যায়ে মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিল পুলিশের সাহায্য চাইবে। বড় বোন বলে দিয়েছে, এয়ারপোর্টে কোনো সমস্যা হলে সরাসরি পুলিশের সাহায্য চাইবি। আমেরিকার পুলিশ হলো বন্ধু—আমাদের দেশের মত না। আর কথা শুরু করবি ‘এক্সকিউজ মি’ বলে আর শেষ করবি ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ দিয়ে। মেয়েটি আশে পাশে তাকাল, কিন্তু পুলিশের পোশাক পড়া তেমন কাউকে চোখে পড়ল না। অবশেষে সে দেখতে পেল একজনকে, বেশ খানিকটা দূরে। মেয়েটি হেঁটে হেঁটে তার কাছে গিয়ে কিছুটা ভড়কে গেল। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় সমান কৃষ্ণবর্ণের বিশালদেহী একজন মানুষ—সে যে একজন পুলিশ সেটা তার পোশাক আর কোমরে ঝুলান পিস্তল না দেখলে বোঝাই যেত না। এই শরীরে সে কিভাবে ক্রিমিনাল তাড়া করে কে জানে। মেয়েটি ঘাড় উঁচিয়ে সাহস করে বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আই নিড হেল্প।’
কৃষ্ণবর্ণের বিশালদেহী সিকিউরিটি অফিসার মেয়েটিকে সরু চোখে একবার দেখল তারপর গম্ভীর মুখে বলল, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই অ্যাম লস্ট। আই নিড হেল্প…’ মেয়েটি পুনরায় একই কথা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল।
‘কল হিম—ডোন্ট ইউ হ্যাভ হিজ ফোন নাম্বার? হ্যোয়ার আর ইউ গোয়িং?’
অফিসারের কণ্ঠস্বরে ধমক না বিরক্তি ঠিক বোঝা গেল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিতে এরা সাধারণত একটু নরম সুরে কথা বলে—অভয় দেয়। কিন্তু এই অফিসারের কণ্ঠ যেন একটু রুক্ষ—একটু না বেশ রুক্ষ। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে লাগেজের উপরে সেঁটে দেয়া একটা সাদা কাগজে লেখা ফোন নাম্বার দেখাল।
অফিসার কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘ইট’স হিজ নাম্বার?’
‘ইয়েস ইয়েস।’
‘ডিড ইয়্যু কল?’
‘আই ডোন্ট নো…’
অফিসার বুঝতে পারল না মেয়েটি ঠিক কি বোঝাতে চাইছে। সম্ভবত ঘাবড়ে গেছে। সে বলল, ‘লেট মি কল।’ বলেই সে নাম্বার দেখে ফোন করল। কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। সে লাইন কেটে দিয়ে আবার ফোন করল, এবারো কোনো সাড়া পেল না। অফিসার বলল, ‘আর ইয়্যু শিওর দিস ইজ দ্য রাইট নাম্বার? নো ওয়ান ইজ এন্সারিং…’
মেয়েটি চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছে না—ভুলটা কোথায় হচ্ছে? ফোন ধরবে না কেন? সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল।
অফিসার এবার জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়াটস ইয়োর নেম, ম্যাম?’
‘মাই নেম ইজ সোমা ইসলাম।’
অফিসার লক্ষ্য করল লাগেজের গায়ে লেখা আছে, সোমা ইসলাম কেয়ার অফ শহীদুল ইসলাম। সে জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ শাহীডুল ইজলাম?’
‘মাই হাজবেন্ড।’
‘ও-আই সি! সো হি ডিডন্ট শো আপ! ইজ দিস দ্য এড্রেস ইয়্যু’আর গোয়িং টু?’ লাগেজের উপর লেখা ঠিকানা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল অফিসার।
‘ইয়েস।’
‘ডু ইউ হ্যাভ হিজ পিকচার?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটি বলল, ‘নো।’
অফিসার কি যেন ভাবল। তারপর পরামর্শ দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ম্যাম, লুক ওভার দেয়ার…’ অফিসার রাস্তার ওপারে দাঁড়ানো সারি সারি ট্যাক্সি ক্যাবের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। ‘ইউ ক্যান টেক অ্যা ক্যাব অ্যান্ড গো হোম।’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে সোমা নামের মেয়েটি এবার সাহস করে টার্মিনালের বাইরে চলে এলো। কিছুদূর এগিয়ে গেল সামনের দিকে। তার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট। ভয়ে কিছুটা কেঁদেও ফেলল সে। আরো কিছুদূর এগিয়ে উল্টো দিকের রাস্তায় দেখতে পেল লাইন দিয়ে অপেক্ষারত হলুদ রঙের ট্যাক্সি ক্যাবগুলো। সোমা ভাবল, শহীদও তো ট্যাক্সি চালায়। এদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে কি কাজ হবে? কেউ কি চিনবে? নাকি একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাবে শহীদের বাসায়? তার কাছে বেশ কিছু ডলার আছে—ভাড়া নিয়ে সমস্যা হবে না। পরক্ষণেই চিন্তা করল, একা একা না জেনে কোথায় যাবে সে? যদি ট্যাক্সিওয়ালা তাকে ঠিকমত পৌঁছে না দেয়? এমনও তো হতে পারে যে গিয়ে দেখল শহীদ বাসায় নেই—তখন? আর সেটার সম্ভাবনাই বেশি। তখন তো সমস্যা আরো হবে। তারচেয়ে বরং আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই ভালো।
কিন্তু আর কতক্ষণই বা অপেক্ষা করবে সে। অস্থির অস্থির লাগছে। বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে কান্না উঠে আসছে। শুধুই মনে পড়ছে দেশের কথা।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-১)
with
no comment

